• , |
  • ঢাকা, বাংলাদেশ ।
সর্বশেষ নিউজ
* সমমনাদের সঙ্গে বিএনপির বৈঠক : রোডমার্চ, লংমার্চ ও সমাবেশের আসছে * আদালতের রায়ের পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা নেই: কাদের * রোববার কোটা বিরোধীরা সড়কে নামলেই কঠোর ব্যবস্থা নেবে সরকার * পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে হারলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী * রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে ইতিবাচক মিয়ানমার : পররাষ্ট্রমন্ত্রী * বাংলাদেশ সব দিক থেকেই ডুবে গেছে : আমীর খসরু * আবারো মিয়ানমারের শতাধিক সেনা ও বিজিপি সদস্য পালিয়ে এসেছে টেকনাফে * শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তি কর্মসূচী ঘোষণা শিক্ষার্থীদের * অ্যান্ডারসনের বিদায়ী টেস্টে ইংল্যান্ডের দাপুটে জয় * রাবি শিক্ষার্থীদের রেললাইন অবরোধ

অযোগ্যতার বিস্তার ও প্রশ্ন ফাঁসে দুর্নীতির পাহাড়

news-details

ছবি: সংগৃহীত


বাংলাদেশে নিয়োগ, ভর্তি পরীক্ষা, অ্যাকাডেমিক পরীক্ষা সবখানেই আছে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা। প্রশ্ন ফাঁস করে কিছু মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়ছে, অন্যদিকে নানা সাফল্যের পালক উঠছে অযোগ্যদের মাথায়৷

অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার পর মামলা হয়, অভিযুক্তরা গ্রেফতারও হয়। গ্রেফতার হলেও অপরাধীরা কি শাস্তি পায়?

বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)-র প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত অভিযোগে ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ৷ ১৭ জনের মধ্যে আলোচনার শীর্ষে আছেন পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যানের গাড়িচালক আবেদ আলী। তিনি বছরের পর বছর সরকারি এই গুরুত্বপূর্ণ চাকরির প্রশ্ন ফাঁস করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ। প্রশ্ন ফাঁস-কাণ্ডে তার সাথে পিএসপির কয়েকজন কর্মকর্তাও জড়িত ছিলেন।

পিএসসির বর্তমান চেয়ারম্যান মো: সোহরাব হোসাইন এখনো যেন প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি নানাভাবে অস্বীকারের চেষ্টা করছেন। তিনি মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন,‘যে প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়, সেখানে ফাঁস করার সুযোগ খুব কম। তবে তিনি এ-ও বলেছেন,তারপরও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। যদি কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই প্রশ্ন বানিয়ে ফেসবুকে আপলোড করেন এবং সেটিকে পিএসসির প্রশ্ন দাবি করেন।

সিআইডির আটক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সিআইডি থেকে কোনো প্রতিবেদন পাইনি, তাই আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সাসপেন্ড লেটার তৈরি করা হয়নি। গ্রেফতার দেখানোর সাথে সাথেই তাদের সাসপেন্ড লেটার দেয়া হবে।

সিআইডি পিএসসির উপ-পরিচালক আবু জাফর, উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম, সহকারি পরিচালক আলমগীর কবির, অডিটর প্রিয়নাথ রায়, ডেসপাস রাইডার খলিলুর রহমান, অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম ও অবসরপ্রাপ্ত ড্রাইভার সৈয়দ আবেদ আলীকে আটক করেছে।

পিএসসির বাইরে নারায়ণগঞ্জের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের নিরাপত্তা প্রহরী শাহাদাত হোসেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের মেডিক্যাল টেকনিশিয়ান নিয়ামুন হাসান, নোমান সিদ্দিকী, আবু সোলায়মান মো: সোহেল, জাহিদুল ইসলাম, মামুনুর রশীদ, সাখাওয়াত হোসেন, সায়েম হোসেন, লিটন সরকার ও সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামকেও আটক করা হয়েছে। সোহানুর রহমান সিয়াম পিএসসির ড্রাইভার আবেদ আলীর ছেলে ও ছাত্রলীগ নেতা।

আটকরা পুলিশকে জানিয়েছে তারা ৩৩তম বিসিএস থেকে সর্বশেষ ৪৫তম বিসিএস পরীক্ষাসহ নন-ক্যাডার নিয়োগের একাধিক পরীক্ষায়র প্রশ্ন ফাঁস করেছে। পিএসসির মাধ্যমে এখন শুধু বিসিএস ক্যাডার নয়, সরকারের বিভিন্ন দফতরের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদেরও নিয়োগ দেয়া হয়।

সিআইডি যা বলছে

বিসিএসের এই প্রশ্ন ফাঁসে খোদ সিআইডির কর্মকর্তারাও বিস্মিত। একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা তদন্তের শুরুতে নিজেরাই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কিন্তু একপর্যায়ে বিস্ময় ভেঙে আমরা দেখতে পাই খোদ পিএসসির কিছু কর্মকর্তাই এর সাথে যুক্ত। আমরা দেখতে পেয়েছি পিএসসিতে কয়েকজনের নেতৃত্বে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই প্রশ্ন ফাঁসের সাথে যুক্ত। এর মাধ্যমে তারা কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন।

তার কথা, শুধু বিসিএস ক্যাডারাই নয়, নন-ক্যাডারের প্রশ্নও ফাঁস করেছে তারা। এর মধ্যে রেলওয়ে অন্যতম। তারা প্রশ্নফাঁসের রীতিমতো হাট বসিয়েছিল।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আজাদ রহমান বলেন, আমরা যাদের আটক করেছি, তাদের মধ্যে ড্রাইভার আবেদ আলীসহ সাতজন মঙ্গলবার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের জবানবন্দিতে তারা বিসিএসসহ পিএসসির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের বিস্তারিত জানিয়েছেন। আর বাকি ১০ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের আমরা রিমান্ডে আনবো।

তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এখন আমরা মূলত প্রশ্ন ফাঁসের তদন্ত করছি। এর সাথে তাদের সম্পদের অনুসন্ধানও করা হবে। যারা সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারি, তাদের সম্পদের অনুসন্ধান করবে দুদক, অন্যগুলো আমরা করবো। এটা স্পষ্ট যে যারা প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত, তারা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

সিআইডির একটি সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃতদের জবানবন্দিতে পিএসসির আরো কয়েকজন কর্মকর্তার নাম এসেছে। যাচাই করে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হতে পারে।

রেলওয়ের নিয়োগ পরীক্ষার নামে ব্যবসা

বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি মো: মনিরুজ্জামান মনির অভিযোগ করেন,‘২০২০ সাল থেকে রেলওয়ের নিয়োগ শুরু হয় পিএসসির মাধ্যমে। আর তখন থেকেই পিএসসির কিছু কর্মকর্তা প্রশ্ন ফাঁস করে রেলওয়েতে নিয়োগ-বাণিজ্য শুরু করে। তারা এর জন্য ধাপে ধাপে অর্থ নেয়। প্রতিটি নিয়োগে ২৫-৩০ লাখ টাকা আয় করে তারা। আমরা অভিযোগও করেছি। কিন্তু পিএসসির মতো একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে তখন কেউ কথা বলার সাহস করেনি। এখন তো বাস্তব পরিস্থিতি প্রকাশ হলো।’

তিনি বলেন, ওই চক্রটি নিয়োগ পরীক্ষা শুরুর আগে যাদের কাছে প্রশ্ন বিক্রি করে, তাদের ঢাকায় নির্দিষ্ট জায়গায় রাখে। তাদের পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্ন দিয়ে পড়াশুনা করিয়ে হলে পাঠায়। ওই সময়ে তাদের মোবাইলফোন রাখতে দেয় না। তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখে। এভাবে এমসিকিউ পাশ করানোর পর পরবর্তী ধাপগুলোতেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করে। সর্বোচ্চ ২০ ভাগ মেধায় চাকরি হয়। বাকি ৮০ ভাগ এইভাবে নিয়োগ হয়।

তার কথা, এখানে ড্রাইভার বা ছোট কর্মচারি গ্রেফতার হলেও এর সাথে টপ টু বটম সবাই জড়িত।

তিনি বলেন, শুধু রেলওয়ে নয়, সব নিয়োগেই এরকম হয়। আগে আমরা প্রমাণসহ অভিযোগ দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

সিআইডির হাতে আটক পিএসসির অফিস সহকারি সাজেদুল ইসলাম সিআইডিকে জানিয়েছেন, তিনি পিএসসির উপ-পরিচালক জাফরকে ২ কোটি টাকা দিয়ে রেলওয়ের প্রশ্ন কিনেছিলেন। পরে তিনি এই প্রশ্ন চাকরিপ্রার্থীদের কাছে বিক্রি করেন।

প্রশ্ন ফাঁস নিয়মিত ঘটনা

নিয়োগ পরীক্ষায় শুধু বিসিএস নয়, অন্য নিয়োগেরও প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এর আগে ব্যাংকে কর্মকর্তা নিয়োগের পরীক্ষা, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা, মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাও আছে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস অনেকবার হয়েছে। আর সর্বশেষ নতুন শিক্ষাক্রমের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির অর্ধ বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে।

কিন্তু এইসব ঘটনায় মামলা ও গ্রেফতার হলেও শেষ পর্যন্ত প্রায় সবাই ছাড়া পেয়ে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ও বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৭ জন ছাত্রসহ ১২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয় ২০১৭ সালে। তাদের অনেককে গ্রেফতারও করা হয়। কিন্তু আদালতের বিচারে তারা সবাই ২০২২ সালের ৩ জানুয়ারি খালাস পান। এটি ছিল প্রশ্ন ফাঁসের সবচেয়ে বড় চক্র।

২০০৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত নিয়োগসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে ২০০ মামলা হয়। ২০২২ সাল পর্যন্ত ৪৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। তার মধ্যে সাজা হয়েছে মাত্র একটি মামলায়। ৪৪টি মামলায়ই আসামিরা খালাস পেয়েছেন।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, এখন প্রশ্ন ফাঁস সবখানে। বিসিএসের প্রশ্নও যখন ফাঁস হয়, তখন তো আর আস্থার জায়গা থাকে না। আমার প্রশ্ন এতটা নৈতিক অধঃপতনের লোক পিএসসিতে কীভাবে নিয়োগ পায়? শুধু ড্রাইভারকে ধরলেই চলবে না। এর মূল খুঁজে বের করতে হবে।

তার কথা, বিচারহীনতায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আর আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ করি, কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস আটকাতে পারি না। সদিচ্ছা থাকলে এটা বন্ধ করা সম্ভব। সেটা কীভাবে সম্ভব, আমরা বার বার বলেছি। ডিজিটালি পরীক্ষার এক ঘণ্টা আগে প্রশ্ন ছাপানো যায়। সেটা করা হলে আর প্রশ্ন ফাঁস হবে না।

সূত্র : ডয়েচে ভেলে


এনএনবিডি ডেস্ক:

মন্তব্য করুন