• , |
  • ঢাকা, বাংলাদেশ ।
সর্বশেষ নিউজ
* আজ থেকে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন শুরু * ব্রিটিশ এয়ার ফোর্সের বিমান বিধ্বস্তে পাইলট নিহত * বুরকিনা ফসোতে জান্তা সরকারের মেয়াদ বাড়ল আরও ৫ বছর * ফাঁদে ফেলে ইসরাইলি সেনাকে ধরে নিয়ে গেছে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা * এমপি আজিম হত্যাকাণ্ড: তদন্তে কলকাতা গেল ডিবির প্রতিনিধি দল * কারিগরি শিক্ষায় আগ্রহ কমছে শিক্ষার্থীদের * ঘূর্ণিঝড় রেমাল: সমুদ্রবন্দরে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত * ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় রেমাল, দুপুরে আঘাত হানার শঙ্কা * ভারতে শিশু হাসপাতালে আগুনে পুড়ে ৭ নবজাতকের মৃত্যু * মোস্তাফিজের রেকর্ডে ১০ উইকেটে জিতল বাংলাদেশ

মে দিবস প্রত্যাশা পূরণের প্রতীক হয়ে উঠেছে কী?

news-details

ছবি : সংগৃহীত


পহেলা মে বিশ্বব্যাপী শ্রমিক দিবস বা মে দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। এদিন সরকারি বেসরকারি সকল অফিস কল-কারাখানা থাকে বন্ধ। দিবসটি উদযাপনে নানা শ্রেণি পেশার বিশেষত শ্রমিকরা বিভিন্ন আয়োজন করে থাকে। তবে দিবসটির প্রতিপাদ্যটি আসলে কমই সামনে আসছে। যা আসছে তা থাকছে বক্তৃতা বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ। কার্যকারিতার খাতা সবসময়ই থাকছে খালি। অঙ্কিত হচ্ছে না নতুন কোন চিহ্ন বা মাত্রা।

এই দিবসটির আলোকে বর্তমানকে মূল্যায়নে একটু ইতিহাসের দিকে নজর দেওয়া দরকার। দিবসটির প্রেক্ষাপট কী ছিল -কালক্রমে তা কোন পর্যায়ে উপনীত হয়ে কর্মসূচিতে আবদ্ধ হলো। ১৮৮৬ সালে ব্রিটিশ সমাজ সংস্কারক রবার্ট ওয়েনের এক চিন্তা থেকে, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রেড ইউনিয়নগুলো দিনে ঘণ্টা কাজের দাবিতে এক বিরাট প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করে। রবার্ট ওয়েন ঘণ্টা কাজের দাবি পূরণে স্লোগান ঠিক করেন, 'আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন এবং আট ঘণ্টা বিশ্রাম'

শ্রমিকদের এই দাবির জন্য সবচেয়ে বড় আন্দোলনটা হয়েছিল মে শিকাগোতে। সেসময় এই আন্দোলনে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক সমবেত হয়েছিলেন। তবে সেসময়ের চিত্র আন্দোলনের পরে কিছুটা বদলেছে। সেসময় বিরামহীন বা টানা কাজ করে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। পরে সেটির পরিবর্তে নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারিত হয়েছে। আর সেসময় শিকাগো ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পকারখানা ইউনিয়ন সংগঠনগুলোর কেন্দ্র।

পরবর্তী কয়েক দিনে এই আন্দোলনকে ব্যবসায়ী রাজনীতি মহল পছন্দ না করলেও, আরও হাজার হাজার ক্ষুব্ধ শ্রমিক আন্দোলনকারী এতে যুক্ত হতে থাকেন। সময় কিছু নৈরাজ্যবাদীরাও এতে যোগ দেন- যারা কোন রকম নিয়ম আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সামাজিক কাঠামো স্বীকার করেন না। উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকে, পুলিশ বিক্ষোভকারীদর মধ্যে সংঘর্ষ দেখা দেয়, একজন মারা যায় এবং অনেকে আহত হয়।

প্রশ্ন হলো সেই সময়ের শ্রমিক আন্দোলনের আবেদন কি এখন ফুরিয়ে গেছে? কিংবা এমন কোনো শ্রমনীতি কি বাস্তবায়িত হয়েছে বিশ্ব সংকটমুক্ত হয়েছে? এটির সহজ একবাক্যে উত্তর হলোনা আমরা যদি বিশ্ব ব্যবস্থা বিভিন্ন অঞ্চলের রাষ্ট্রসমূহের কাঠামোর আলোকে শ্রমিকদের অধিকার, সমস্যা, কর্মপরিবেশ, মজুরি জীবনমান বিবেচনা করি- তাহলে সেই চিত্র পরিষ্কার হয়। আধুনিক সভ্যতার এই যুগে একটু গভীরে গিয়ে দেখলে এখনো লোমহর্ষক সব ঘটনা সামনে আসে। বিগত কয়েক শতাব্দী আগে দাসত্ব প্রথা নির্যাতনের মতো অমানবিক যেসব কৃষ্টি-কালচার ছিল তা আজও ধরন বা রূপ পরিবর্তন করে বিদ্যমান।

পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজও শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার পাওয়ার জন্য লড়াই করছে। অধিকার আদায়ের লড়াই কিংবা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সুযোগ-সুবিধা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, নিয়মিত মজুরি না দেওয়া, সহ নানা রকম বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকেন শ্রমিকরা।  বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের শ্রমখাতের সব জায়গায় এমন অভিযোগ রয়েছে। দেশের বৃহত্তর শ্রমখাত গার্মেন্টসসহ অন্যান্য শিল্প-কলকারখায় কর্মরত শ্রমিকরা নানা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১২৯ জন শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৬ জন।  আর আহত হয়েছেন ২১৩ জন। কারখানা, বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সড়ক নৌপথে এসব ঘটনা ঘটেছে বলে এইচআরএসএ এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

এইচআরএসএসের তথ্যে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশে ৯২টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ২৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ১২৮ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় ৪৪ জন শ্রমিক মারা গেছেন। সময়ে সাতটি গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। তবে এসব ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরাও রেহাই পাচ্ছেন না। গত ১৮ জানুয়ারি গাজীপুরে একটি বেসরকারি কারখানায় নিহত হন নারগিছ আক্তার, রিফাত হাসান শিউলি আক্তার নামের তিন নারী শ্রমিক।

বাংলাদেশের শ্রম আইনআন্তর্জাতিক লেবার এর মানদন্ড কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। অতি আইএলও কিছুদিন আগেও বাংলাদেশের শ্রম আইন সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক সেই সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়েনের জন্য কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন। স্বাধীনতার এতো বছর পরও দেশের শ্রম আইন সময়োপযোগী হয়নি। যার কারণে সাভারের রানা প্লাজা ধসে হাজার হাজার শ্রমিকের মৃত্যু, তাজরিন ফ্যাশন দুর্ঘটনাসহ অসংখ্য দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়েছে দেশ। আজও বেতন-ভাতার দাবিতে ঈদের আগে সড়ক-মহাসড়কে নামতে হয় শ্রমিকদের। বিদ্যমান আইনে শ্রমিকদের সুরক্ষা না থাকায় একই ধরণের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি বহু বছর ধরে হয়ে আসছে।

এমনি পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শ্রমিক সংগঠন- শ্রমিক লীগ, শ্রমিক দল, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ অন্যান্য সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে দিনটি উদযাপন করছে। আদতে তাদের কর্মসূচিগুলো শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় কতটুকু কার্যকর ভূমিকা পালন করছে তা বিগত সময়ের শ্রমিক সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা, অনিয়ম বৈষম্যের ঘটনাগুলো সামনে রাখলে তা পরিস্কার হয়। অধিকার আদায় কখনো একপক্ষীয় উদ্যোগে সম্ভব নয়। এজন্য শ্রমিক মালিক পক্ষকে সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের শ্রমিক অসন্তোষের কারণগুলো চিহ্নিত করতে না পারলে তা সহজে সমাধান করা সম্ভব হবে না। প্রথমত  সক্ষমতার ভিত্তিতে শ্রমিক-মালিক পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।

ইসলামে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারও একটি পক্ষ হিসেবে কাজ করে। যথাযথ আইনের বাস্তবায়ন বিধি অনুযায়ী তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর করলে সমস্যার সমাধান অনেকাংশে সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কিছুটা বিস্মিত করেছে জাতিকে। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ আছে সরকার মালিক পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করার নীতি অবলম্বন করেছে। দেশের কয়েকটি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে। ২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা ট্রাজেডির সময় বিষয়টি বেশি আলোচিত হয়েছে। কারণ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর সেই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন। তিনি একটি বক্তব্যে বলেছিলেন বিরোধী দলের কর্মীরা বিল্ডিংয়ের খুঁটি ধরে ধাক্কাধাক্কি করায় ভবন ধসে পড়েছে। পরে জানা যায় রানা প্লাজার মালিক সরকার দলীয় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। এমনকি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পাননি। অপরাধীরা ক্ষমতার ছোয়ায় পার পেয়ে গেছে। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে এমন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দেখতে হয়, যা স্থায়ী ক্ষতির কারণ।

শ্রমিকদের অধিকার বা হকের ক্ষেত্রে নির্দেশনা হলো- ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগে মজুরি দিয়ে দেওয়া। শ্রমিক মালিক পক্ষতে একে অপরের আমানতদার হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে। শ্রমিক মালিক শুধু আর্থিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নয় বরং বৃহৎ সমাজের প্রতি দায়বন্ধতা নিয়ে তা পরিচালিত করতে হবে। সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থাপনার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার বিকল্প কিছু হতে পারে না।

 

শ্রমিকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে সমস্যার মূলে যেতে হবে। মে শ্রমিক দিবসকেঅর্থবহ করে তুলতে হলে আইনের প্রয়োগ, নীতির বাস্তবায়ন, মূল্যবোধকে ধারণ করতে হবে। তবে দিনটি অর্থবহ হবে, ফিরে পাবে শ্রমিক তার অধিকার, বঞ্চিত হবে না মানবতা।


এম এ জিসান

মন্তব্য করুন