• , |
  • ঢাকা, বাংলাদেশ ।
সর্বশেষ নিউজ
* জাতীয় ঈদগাহে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত * আগামীকাল পবিত্র ঈদুল আজহা * সৌদি আরবে জর্ডান ও ইরানের ১৯ হজযাত্রীর মৃত্যু * শুভেচ্ছা * ফ্রিজে গরুর মাংস পাওয়ায় মধ্যপ্রদেশে ১১ মুসলিমের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিল পুলিশ * সেন্টমার্টিন পরিস্থিতি নিয়ে ছাত্রশিবিরের উদ্বেগ প্রকাশ * সীতাকুণ্ডে গঙ্গাস্নানে নেমে পদদলিত হয়ে দুই শিশুর মৃত্যু * মৌসুমের শুরুতেই দুই বিভাগে ভারী বৃষ্টি ও বন্যার শঙ্কা * গাজার দক্ষিণে কৌশলগত যুদ্ধবিরতি ইসরাইলের * সোনালী ব্যাংককে ১ কোটি রুপি জরিমানা ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

ইসরাইলি বর্বরতার নেপথ্যে শক্তির উৎস

news-details

ছবি: সংগৃহীত


গত অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনে মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে ইসরাইল। সন্ত্রাসবাদি দেশটির হামলায় এ পর্যন্ত ৩৬ হাজারের অধিক নিরীহ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সাথে আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৮০ হাজার। এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন ৮২ হাজারের অধিক নারী, পুরুষ ও শিশু।  মুহুর্মুহ হামলার কারণে ধ্বংসস্তুপের মধ্যে আটকা পড়া হতভাগাদের উদ্ধার করতে পারছে না স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। পরিসংখ্যান বলছে, হামলায় হতাহতদের ৭০ শতাংশই নারী ও শিশু। এ ধরনের বেসামরিক নাগরিকদের উপর হামলা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন হলেও বিশ্ব মোড়লরা কোন ধরনের প্রশ্ন তুলছে না। হামলা বন্ধে নিরাপত্তা পরিষদে বারবার প্রস্তাব উঠলেও আমেরিকার ভেটোতে তা ভেস্তে গেছে। বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা যুদ্ধাপরাধ হলেও তার জন্য করা হচ্ছে মৃদু ভর্ৎসনা। যেন ফিলিস্তিনি জনগণের মানবাধিকার থাকতে নেই। সেখানে নেই কোন জবাবদিহিতার বালাই। রাষ্ট্রটি কোন আন্তর্জাতিক আইন কানুন, প্রথা, ন্যায়বোধ সকল কিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে। হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও তার কর্মীরা। গত ১ এপ্রিল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের (ডব্লিউসিকে) গাড়ি বহরে হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে ৭ জনকে। সংস্থাটি এ ব্যাপারে তৃতীয় পক্ষের তদন্ত দাবি করেছে। যদিও তা আলোর মুখ দেখবে কিনা সন্দেহ আছে। আবার এ ন্যাক্কারজনক ঘটনাকে ঢাকতে সিরিয়ায় অবস্থিত ইরানের কনস্যুলেট ভবনে হামলা চালায় দেশটি। নির্বিচার হামলায় আহতদের সেবা প্রদানকারী হাসপাতালগুলোর উপরও বোমা ফেলেছে দেশটি। বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে গাজার সবচেয়ে বড় আল শেফা নামের হাসপাতালটি। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে ইসরাইল এ পর্যন্ত ১৬টি হাসপাতাল ধ্বংস করে দিয়েছে। পশ্চিমাদের নগ্ন সমর্থন মূলত দেশটির এসকল অপকর্ম পরিচালনার মূল শক্তি।

রচনা যোগায় উৎসাহ

দীর্ঘ দুই হাজার বছর ধরে ইহুদি পণ্ডিতরা  ধর্মের আইন কানুনের উপর বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেছেন। দ্বিতীয় খ্রিস্ট শতাব্দীতে আকিবা বিন ইউসুফ রচনা করেন মিশনাহ ও মাদরাস নামক গ্রন্থ। ৬ ষ্ঠ খ্রিস্টাব্দে মিশনাহ ও গুমারাকে একত্রিত করে লেখা হয় তালমুদ। ১১শ শতকে ইসা আল ফাসী হালাখুচ নামক গ্রন্থ রচনা করেন। ১২ শতকে মুসা মায়মুনি রচনা করেন মিশনাহ তাওরাত। আবার ১৪ শতকে ইয়াকুব বিন আসহার ও ১৬ শতকে ইউসুফ কারু রচনা করেন শোলখান নামের গ্রন্থটি। মূলত এ সকল গ্রন্থ তাদের মানসিক জগৎ গঠনে বিরাট ভুমিকা পালন করেছে। তবে ১৯০৬ সালে ইন্ডিয়ানা পলসের সম্মেলনে ওল্ড টেস্টামেন্টকেই অধিক মর্যাদা প্রদানের ব্যাপারে ঐকমত্য প্রদান করে পন্ডিতরা।

ইহুদিদের বর্তমান ওল্ড টেস্টামেন্টের গ্রহণযোগ্যতা: বর্তমানে ইহুদিদের কাছে ওল্ড টেস্টামেন্ট নামে তাওরাতের যে কপি আছে তা নিজেদের রচিত।  মুসা আলাইহিস সাল্লামের উপর অবতীর্ণ তাওরাত খ্রিস্টপূর্ব ৬ শতকে ধ্বংস হয়ে গেছে। বিশ্ব মনীষীদের মত হচ্ছে বর্তমান ওল্ড টেস্টামেন্ট আসল তাওরাত নয়। হযরত মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেষ সময়ে হযরত ইয়াশু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূল তাওরাত রচনা করেন এবং একটি সিন্দুকে সংরক্ষণ করেন। (ইস্তিসনা ৩১:২৪-২৭) তার মৃত্যুর পর খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে বখতে নসর জেরুজালেম দখল করে বায়তুল মুকাদ্দাসে অগ্নি সংযোগ করেন। আগুনে তাওরাতের সম্পূর্ণ অংশ ভস্মীভূত হয়ে যায়।এরপর হযরত উযাইর আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদি ধর্মীয় পণ্ডিতদের নিয়ে ওহীর নির্দেশনায় আবার তাওরাত রচনা করেন। তবে খ্রিস্টপূর্ব ৪ শতকে গ্রিক মহাবীর জেরুজালেম দখলে নেন। তার সময়ে তাওরাতের গ্রীক অনুবাদ বের হওয়া শুরু করে  এবং হিব্রু ভাষার তাওরাত পরিত্যক্ত হয়। এর মূল কপিটিও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে অনুবাদের মাধ্যমে তাওরাতের মধ্যে অনেক গলদ ঢুকানো হয়। এর মধ্যে অনেক কিছু সন্নিবেশিত করা হয়েছে, আবার অনেক কিছুই বাদও দেয়া হয়েছে। এতে স্থান পেয়েছে ইহুদি পণ্ডিতদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, বনী ইসরাইলের ইতিহাস, ইহুদি পণ্ডিতদের ইজতেহাদ। এ ধর্মগ্রন্থ থেকে অনেক বিষয় কেটে সেটাকে তাওহীদবাদি রুপ থেকে ইহুদিবাদী রুপ প্রদান করা হয়েছে। প্রচলন করা হয়েছে মুসার একত্ববাদী তত্ত্বের বিপরীত মনগড়া ইহুদিবাদ।

বিজয়ী হতে প্রয়োজন দুই শক্তি : কোন শক্তিকে বিজয়ী হতে হলে তাকে দুটি শক্তি অর্জন করতে হয়। প্রথমে প্রয়োজন হার্ড পাওয়ার (রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও ভূ-কৌশল)। অপরটি হলো সফট পাওয়ার বা ধর্মীয় অথবা কোন দর্শনের উপর অবিচল আস্থা। এটাকে বিশ্লেষকগণ দর্শনের উপর নিখাদ প্রেম বলে অভিহিত করেছেন। যেমন নাজিবাদ, জায়নবাদ,সমাজবাদ ইত্যাদি। মূলত প্রয়োগ ক্ষেত্রে বিজয়ী হওয়ার জন্য হার্ড পাওয়ারকে সহায়তা করে সফট পাওয়ার। ইহুদি পণ্ডিতগণ তাদের কর্মযজ্ঞে এখানে সফল। কারণ তারা গোটা ইহুদি জাতির মধ্যে ওল্ড টেস্টামেন্টের আলোকে উন্মাদনা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা এ জাতির মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা গেঁথে দিয়েছে যে, ফিলিস্তিন তাদের ঈশ্বর প্রদত্ত প্রতিশ্রুত ভূমি। আর এ ভূমির একক মালিকানা ঈশ্বর তাদেরকে প্রদান করেছে। যেমন ওল্ড টেস্টামেন্টের ৩৩শ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ‘মাওয়াবের ময়দানে ইয়ারুন নদীর তীরে মহান প্রভু মুসাকে বলেন, তুমি বনী ইসরাইলকে ডাক এবং বল যে তোমরা ইয়ারুন পার হয়ে কেনান ভূখণ্ডে প্রবেশ কর। অতঃপর সেখানকার অধিবাসীদের তাড়িয়ে দাও, তাদের মূর্তিগুলো ধ্বংস করে দাও,তাদের উচ্চ ভবনগুলোকে বিধ্বস্ত করে দাও এবং সেখানে নিজেরা বসতি স্থাপন করো। কেননা এ ভূখণ্ড আমি তোমাদের দিয়েছি।তোমরাই তার মালিক।  (৩৩: ৫০-৫৪) ওল্ড টেস্টামেন্টের ( ৭: ২-৫) বলা হয়েছে, ‘যুদ্ধমান জাতি যখন পরাভূত হবে তখন তাদেরকে খুন করো, তাদেরকে প্রতিশ্রুতিও দিও না। তাদের কৃপাও করো না। তোমরা তাদের বধ্যভূমি ধ্বংস করো। তাদের মূর্তিগুলো মিসমার করে দাও। তাদের ঘনবাগান কেটে ফেল এবং তাদের পাথরের মূর্তিগুলো জ্বালিয়ে দাও।’ 

ইহুদিদের নৃশংস হতে আরো অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে ওল্ড টেস্টামেন্টের ( ৩৪:১১-১২) পংক্তি। এখানে নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আজকের এই দিনে আমি তোমাকে যে নির্দেশ দেব তা মনে রাখবে। আমি আমুবি, কেনানি, হিত্তি, ফারাজি, হাভি ও ইয়াবুসীদেরকে তোমার সামনে থেকে তাড়িয়ে দাও। সাবধান এমন যেন না হয় যে, যে ভূখণ্ডে তুমি যাচ্ছ তার অধিবাসীদের সাথে চুক্তি সম্পাদন করে নিলে আর সেই চুক্তি তোমার গলার কাঁটা হল। বরং তুমি তাদের বধ্যভূমি মিসমার করে দাও, তাদের মূর্তিগুলো চূর্ণ করে দাও। এগুলোই হলো ইহুদিবাদের চুড়ান্ত শিক্ষা। তারা এ শিক্ষাকে প্রয়োগ করেছে বিভিন্ন জাতির উপর। এজন্য ইতিহাসের চুড়ান্ত শিক্ষাও তারা পেয়েছে।  তবে ১৯৪৮ সালের পর থেকে এ দর্শনের অনুশীলন শুরু করে ফিলিস্তিনের জনগণের বিরুদ্ধে যা আজ অবধি অবলীলায় চলছে। মূলত ফিলিস্তিনে ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের মূল তত্ত্ব উত্তরাধিকার নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। আর পশ্চিমারা এ নীতিকে বাস্তবায়ন করতে সকল প্রকার সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করে যাচ্ছে। এর একমাত্র উদ্দেশ্য মুসলিম জাতি অধ্যুষিত গোটা মধ্য প্রাচ্যকে পদানত করে রাখা। একথা সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, জায়নবাদী এ রাষ্ট্রটির মাধ্যমে মধ্য প্রাচ্যে প্রক্সি যুদ্ধ চালাচ্ছে পশ্চিমারা। তবে পূর্বে মুসলিম দেশগুলোর উপর যে এক তরফা হামলা পরিচালনা করা হত এখন তা সম্ভব হচ্ছে না। মুসলিম দেশগুলোতে সয়ংক্রিয়ভাবে গড়ে উঠেছে হুথি, হিজবুল্লাহ ও হামাসসহ অনেক সশস্ত্র সংগঠন। ফলে প্রায়ই প্রতিরোধের মুখে পড়তে হচ্ছে জায়নবাদী এ রাষ্ট্রটিকে। গাজায় চলমান যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে ইসরাইলি বিখ্যাত সাংবাদিক আরি শাভিভ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, ইসরাইল এমন ধ্বংসাত্মক পথে চলতে থাকলে দেশটি নিজেই ধ্বংস হয়ে যাবে। এদিকে গত সপ্তাহে ইসরাইলের শিন বেত সিক্রেট সার্ভিসের প্রাক্তন প্রধান অ্যামি আয়লোন সতর্ক করে বলেন যে, তেল আবিবের যুদ্ধ ও আঞ্চলিক সম্প্রসারণ 'ইসরাইলকে শেষে দিকে' নিয়ে যাবে। উভয়েই ইসরায়েলের দখল অব্যাহত রাখলে দেশটির কঠিন ভবিষ্যতের আশঙ্কা করে সতর্ক করে বই লিখেছেন।

গাজা যুদ্ধ যেন শেষ পরিণতির শুরু ডেকে আনতে পারে। তবে সেটা ফিলিস্তিনের জন্য নয়, বরং ইসরাইলের জন্য। দক্ষিণ আফ্রিকার রক্তাক্ত আধিপত্যবাদী বর্ণবিদ্বেষী শাসকগোষ্ঠীর যেমন পতন এসেছিল, ঠিক তেমনি শীঘ্রই ইসরায়েলেও পতন হতে পারে। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের মুক্তিকামী আধ্যাত্মিক নেতা শায়খ আহমাদ ইয়াসিন। যিনি ২০০৪ সালের ২২ মার্চ ইসরাইলের বোমার আঘাতে শহীদ হন। যিনি ছিলেন গাজা বিশ্ববিদ্যালয় ও হামাসের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি কুর'আনে বর্ণিত অতীত সম্প্রদায়গুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করে বলেছিলেন, ‘২০২৫ সালের মধ্যে ইসরাইলের অস্তিত্ব বিলীন হবে’। হয়ত সেদিন বেশি দূরে নয় যে, পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে এই উগ্র ইহুদি গোষ্ঠিটি। তবে তার জন্য প্রয়োজন মুসলিম জনগণের পুনরায় জেগে ওঠা এবং দেশগুলোর মধ্যে ইস্পাত কঠিন সুদৃঢ় ঐক্য।

লেখক : আব্দুল খালেক 

শিক্ষক ও কলামিস্ট


আব্দুল খালেক

মন্তব্য করুন