• , |
  • ঢাকা, বাংলাদেশ ।
সর্বশেষ নিউজ
* জাতীয় ঈদগাহে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত * আগামীকাল পবিত্র ঈদুল আজহা * সৌদি আরবে জর্ডান ও ইরানের ১৯ হজযাত্রীর মৃত্যু * শুভেচ্ছা * ফ্রিজে গরুর মাংস পাওয়ায় মধ্যপ্রদেশে ১১ মুসলিমের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিল পুলিশ * সেন্টমার্টিন পরিস্থিতি নিয়ে ছাত্রশিবিরের উদ্বেগ প্রকাশ * সীতাকুণ্ডে গঙ্গাস্নানে নেমে পদদলিত হয়ে দুই শিশুর মৃত্যু * মৌসুমের শুরুতেই দুই বিভাগে ভারী বৃষ্টি ও বন্যার শঙ্কা * গাজার দক্ষিণে কৌশলগত যুদ্ধবিরতি ইসরাইলের * সোনালী ব্যাংককে ১ কোটি রুপি জরিমানা ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

বাজেটে শিক্ষাখাতের বরাদ্দ হতাশাজনক

news-details

ছবি: সংগৃহীত


২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ,  যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।  শিক্ষাখাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরামর্শ  দিয়েছিল ইউনেস্কো, যা প্রস্তাবিত বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি।

শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কম দেওয়ার কারণে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণে বাংলাদেশকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদরা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের বাজেট-পরবর্তী এক আলোচনায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জিডিপির শতাংশ হিসেবে বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে গড় ব্যয় ছিল ৪১ টি দেশের মধ্যে পঞ্চম সর্বনিম্ন। 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই হ্রাসের প্রবণতায় ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অর্জন করা সম্ভব হবে না।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মন্তব্য করেছেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে বাজেট সবচেয়ে কম।’

‘স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর আরও অর্থনৈতিক দক্ষতা প্রয়োজন হবে। বর্তমানে শিক্ষার যে মান, সেই অনুযায়ী আমরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা পাব না।’

২০০৯-১০ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট প্রথম বাজেট পেশ করার পর থেকে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। এর মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকার শিক্ষাখাতে জিডিপির সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ বরাদ্দ দিয়েছে। এরপর থেকে গত ৭ বছরে এই বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে কমেছে এবং ক্ষমতাসীন সরকারের বর্তমান মেয়াদের শেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে এটি একবারে তলানিতে পৌঁছেছে। 

ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশনের নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘শিক্ষা আন্দোলনকারীরা দীর্ঘদিন ধরে এই খাতে বাজেট বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু তাদের দাবির কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।’

‘শিক্ষাখাতে বাজেট হতাশাজনক। বাজেট বক্তৃতা চমৎকারভাবে তৈরি করা হয়েছে, সবকিছু সেখানে রয়েছে। এতে স্মার্ট নাগরিক, মূল্যবোধসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তি ও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে এগুলো নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনাই বক্তৃতায় অনুপস্থিত।’

 সিপিডি ‘২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বিশ্লেষণ শীর্ষক উপস্থাপনায় বলেছে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৩৫ টি স্বল্পোন্নত দেশ গড়ে তাদের জিডিপির ২ শতাংশ বা তার বেশি শিক্ষাখাতে ব্যয় করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশের গড় শিক্ষা ব্যয় ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৮ শতাংশ। শুধু সোমালিয়া  দশমিক ২ শতাংশ,  হাইতি ১ দশমিক ৫ শতাংশ, দক্ষিণ সুদান ১ দশমিক ৫ শতাংশ ও মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ নিয়ে তালিকায় বাংলাদেশের পরে রয়েছে।

সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র আফ্রিকার দেশ, যা সংঘাতে বিপর্যস্ত। এসব দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও ক্রমবর্ধমান সহিংসতার কারণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাংভিত্তিক সহিংসতা ক্যারিবিয়ান দেশ হাইতিকে বিপর্যস্ত করে রেখেছে, যা ফলে দেশটিতে কলেরার পুনরুত্থান ও চরম মাত্রার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে।

স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে মিয়ানমার জিডিপির ২ দশমিক ১ শতাংশ, কংঙ্গো ও উগান্ডা ২ দশমিক ২ শতাংশ, চাদ ২ দশমিক ৫ শতাংশ, কম্বোডিয়া ২ দশমিক ৬ শতাংশ, রুয়ান্ডা ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, সেনেগাল ও ইথিওপিয়া ৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং সিয়েরা লিওন ৬ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় করে শিক্ষাখাতে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জিডিপির শতাংশ হিসেবে বাংলাদেশের গড় শিক্ষা ব্যয় আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার চেয়েও কম।

তাদের তথ্যে আরও দেখা যায়, ভুটান ২০২১ সালে জিডিপির ৭ শতাংশ, ভারত ২০২০ সালে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, পাকিস্তান ২০২১ সালে ২ দশমিক ৪ শতাংশ, মালদ্বীপ ২০২০ সালে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, নেপাল ২০২০ সালে ৪ দশমিক ২ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা ২০১৯ সালে ১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং আফগানিস্তান ২০১৯ সালে ২ দশমিক ৯ শতাংশ ব্যয় করেছে শিক্ষাখাতে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসির পরিচালক অধ্যাপক আবু ইউসুফ বলেন, ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক রয়েছে৷ এত সামান্য বরাদ্দ নিয়ে শিক্ষাখাতের পক্ষে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখা সম্ভব নয়।’

বাংলাদেশের অবস্থান সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, ভুটান, নেপাল ও আফগানিস্তানের ও পরে এবং শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের নিচে। গবেষণায় যে ১৯৫ টি দেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম। ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের অবস্থান যথাক্রমে ১৪৫, ১৪৯ ও ১৫৪। তালিকায় শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের অবস্থান যথাক্রমে ৭১ ও ৭২। তালিকায় শীর্ষে আছে ইউরোপের দেশ আইসল্যান্ড। অন্যান্য আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার সাফল্যে কমবেশি বলা হয়। বর্তমান স্বাস্থ্যসেবার এ অগ্রগতি অবশ্যই প্রশংসনীয়। 

চলতি অর্থবছরে সরকার শিক্ষাখাতে ৮৮ হাজার ১৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ সাত দশমিক ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ৯৪ হাজার ৭১০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করেছে সরকার। যা মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বাজেট বক্তব্যে বলেন, আগামী অর্থবছরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩৮ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য ৪৪ হাজার ১০৮ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ১০ হাজার ৬০২ কোটি টাকা বরাদ্দ নির্ধারণ করেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৩তম বাজেট এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা চতুর্থ মেয়াদের ও  আবুল হাসান মাহমুদ আলীর প্রথম বাজেট।

গত কয়েক বছরে চিকিৎসা খাতে ব্যয় বেড়েছে ২০২ শতাংশ। শিক্ষায় প্রতি এক টাকা ব্যয়ের বিপরীতে পরিবারগুলোর স্বাস্থ্য ব্যয় ২০২২ সালে ৩.৬৬ টাকায় উঠেছে, যা ২০১৭ সালে ছিল মাত্র ০.৮৪ টাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, স্বাস্থ্য খাতে ক্রমবর্ধমান বাড়তি ব্যয় দেশের পরিবারগুলোকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ফেলে দিয়েছে। গত কয়েক বছরে চিকিৎসা খাতে ব্যয় বেড়েছে ২০২ শতাংশ। ফলে পারিবারিক ব্যয় অগ্রাধিকারে শিক্ষাকে ছাড়িয়ে গেছ স্বাস্থ্য খাত। 

এ বাজেট শিক্ষাখাতের জন্য বলা যায় অর্থনৈতিক বৈষম্যমূলক। একটি দেশের উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়ার কথা থাকলে শিক্ষাখাতকে বেশি গুরুত্বহীনভাবে তুলে ধরা হয়েছে। যা হাস্যকর ছাড়া কিছু নয়।


আবুল কালাম আজাদ

মন্তব্য করুন