• , |
  • ঢাকা, বাংলাদেশ ।
সর্বশেষ নিউজ
* সীমান্তে হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত কিছু না, এটি দুর্ঘটনা : প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা * দেশের ২৪ শতাংশ বাসের ফিটনেস নেই : টিআইবি * বগুড়ায় নিখোঁজ ছাত্রের লাশ মিলল গোয়াল ঘরে * জলবায়ু উদ্বাস্তুদের রক্ষায় আইনি সংজ্ঞা প্রয়োজন * মেজর হাফিজকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ * এখনো নেভেনি এস আলম সুগার মিলের আগুন * রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে হোটেল-রেস্তোরাঁয় অব্যবস্থাপনা, আটক ২৪ * গাজীপুরে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে মহাসড়কে শ্রমিকদের বিক্ষোভ * শিক্ষক রাজনীতি বন্ধে আচরণবিধি তৈরি করছে মন্ত্রণালয় * উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিলে আজীবন বহিষ্কার : বিএনপি‘র হাইকমান্ড

ছাত্রলীগ কর্মীর ধর্ষণকাণ্ড: এমসি কলেজ থেকে জাহাঙ্গীরনগর

news-details

ছবি : সংগৃহীত


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে ছাত্রলীগের নেতাসহ চারজন এরইমধ্যে আটক হয়েছে। প্রশ্ন হলো ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা কেন বার বার ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়ায়?

জাহাঙ্গীরনগরের ঘটনা শনিবার রাতের। যে ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে তাদের মধ্যে দুইজন এখনো পলাতক। অভিযুক্তরা মীর মোশররফ হোসেন হলের ‘এ' ব্লকের ৩১৭ নাম্বার কক্ষে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে বেটানিক্যাল গার্ডেনে নিয়ে ধর্ষণ করে। ধর্ষকদের একজন ওই দম্পতির পরিচিত হওয়ায় তারা কৌশলে তাদের বাইরে থেকে ডেকে আনে।

এই ধর্ষণের সঙ্গে জড়িতদের কেন্দ্রে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন একই বিভাগের সাগর সিদ্দিকী ও হাসানুজ্জামান এবং উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাব্বির হাসান। পলাতক আছেন ভুক্তভোগীর পূর্বপরিচিত মো. মামুনুর রশিদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক মুরাদ হোসেন।

ছাত্র না হয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে অবস্থান এবং ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আর মূল হোতা ছাত্রলীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমানের কয়েকদিন আগের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়েছে। সেখানে তিনি দাবি করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগে তার হাত ছিলো।

ছাত্রলীগের আরো দায়

সিলেট এমসি কলেজের শ্রীকান্ত ছাত্রাবাসে ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ধর্ষণ করে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী। ওই সময় কলেজ বন্ধ থাকলেও হলে থাকতেন জেলা আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার অনুসারী ছাত্রলীগ নেতা কর্মীরা। ঘটনার দিন আক্রান্ত নারী স্বামীকে নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুরতে গিয়েছিলেন। রাত ৮টার দিতে তার স্বামী হোস্টেলের গেটে সিগারেট কিনতে  নামলে ধর্ষকেরা ওই নারীকে ছাত্রাবাসের একটি কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করে। তার স্বামীকেও তারা আটকে রেখে মারধর করে।

ওই ঘটনায় আট ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে তিন বছর আগে আদালতে চার্জশিট দেয়া হলেও এখনও সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি।

এরকম আরও অনেক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালের ২১ জানুয়ারি গোপালগঞ্জের মকসুদপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নঈম কাজীর নেতৃত্বে চারজন এক তরুণীতে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। মামলার দেড় মাস পর পুলিশ ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করে। ওই মামলায় এখনো চার্জশিট হয়নি বলে জানা গেছে।

একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি সাভার সদর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি সোহেল রানা এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। তার বিরুদ্ধে মামলা হলে চারদিন পর র‌্যাব তাকে গ্রেপ্তার করে।

গত ১৪ জানুয়ারি বাগেরহাটের ফফিরহাটে উপজেলা সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিল আহমেদ ও তার সহযোগীরা দুই তরুণীকে রাস্তা থেকে অপহরণ করে নিয়ে ধর্ষণ করে। পরে শাকিলকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও তার সহযোগীরা পলাতক আছে।

২০২৩ সালের ২৫ জুন রাতে রংপুরের পীরগঞ্জে এক গৃহবধুকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয় জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ইয়াসিন  আরাফাতের বিরুদ্ধে। ওই গৃহবধুকে জিম্মি করে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে ওই ছাত্রলীগ নেতা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।

২০১৯ সালে রংপুরের হারগাছা এলাকায় এক স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণের পর তার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় হারগাছার সারাই ইউনিয়নের ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ  সম্পাদক রাসেল মিয়া। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে সিলেট এমসি কলেজে নববধুকে ধর্ষণের ঘটনার পর ধর্ষকদের প্রশ্রয়দাতারা  ওই নারীর চরিত্রহননে নেমেছিল। কারণ জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতা কলেজে কমিটি না থাকলেও তাদের দিয়ে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বাজয় রাখতেন। তিনি চেষ্টা করেছিলেন রাতেই ঘটনাটি মিটমাট করে ফেলতে। না পেরে ওই নেতা তাদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন। পরে অবশ্য পুলিশ তাদের আটক করে। কিন্তু তাদের বিচার এখানো হয়নি। ছাত্রলীগের আট নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে চার্জশিট ও অভিযোগ গঠন হলেও সাক্ষ্য নেয়া হচ্ছে না। গত তিন বছর ধরে সাক্ষীর জন্য ঝুলে আছে। আদৌ প্রভাবশালীদের চাপের মুখে সাক্ষী পাওয়া যাবে কী না সন্দেহ। এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার ও নারীর স্বামীকে হত্যারও হুমকি দেয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিচার কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে কেউ বলতে পারছেন না। সিলেটের নারী নেত্রী তামান্না আহমেদ বলেন, ‘আসলে এমসি কলেজের ঘটনার যদি বিচার হতো তাহলে জাঙ্গীরনগরের ঘটনা হয়তো ঘটত না। আমাদের এখানে এমসি কলেজের ঘটনায় দেখেছি বিচারহীনতা। আর এর পিছনে আছে ক্ষমতা। সাধারণ মানুষ বিচার পায় না। আবার বিচার এড়াতেও পারেন না। ক্ষমতাবানরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যান।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. স্নিগ্ধা রেজওয়ানা মনে করেন,’বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনার সঙ্গে একটা পূর্বাপর সম্পর্ক আছে। এখানে এই ধরনের ঘটনা যখনই ঘটে তার সঙ্গে ক্ষমতার একটা সম্পর্ক থাকে। এর সঙ্গে একটি সিন্ডিকেট যুক্ত।’

তিনি বলেন,’এর সঙ্গে প্রশাসন যুক্ত। বহিরাগতরা হলে থাকে তারা বের করে দেয় না কেন। আর যারা পালিয়ে গেল তারা কীভাবে পালালো? ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার একজনের একটি ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হয়েছে। সে নাকি এখানে নিয়োগ দেয়। তিনমাস আগে একটি বিশেষ ছাত্র সংগঠনের নেতারা ভিসি অফিসে তালা দেয় তাদের লোকজনকে নিয়োগ দেয়ার দাবিতে। তারা নিয়োগ বোর্ড বসতে দেয়নি।’

তার কথা, ‘এগুলো একদিনের ঘটনা নয়। অনেক দিনের ঘটনার একটা জঘন্য প্রকাশ। এখন আপনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন। বহিষ্কার করছেন। কিন্তু এটা দিয়ে কি দায় এড়ানো যায়?

তারা বহুদিন ধরেই করছে

শনিবারের রাতের ঘটনার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যলয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিচারের দাবিতে প্রতিবাদী হয়। বিশেষ করে ধর্ষকদের পালানোর ভিডিও ভাইরাল হলে তারা ফুঁসে ওঠে। রীতিমত হলের একটি গেটের তালা ভেঙ্গে ধর্ষকেরা রাতে পালিয়ে যায়। ওই ঘটনায় শিক্ষার্থীরা হল প্রশাসনকে দায়ী করে। প্রতিবাদকারীদের একজন ড্রামা এন্ড ড্রামাটিকস-এর ছাত্র কনোজ কান্তি রায়। তিান বলেন,’ক্যাম্পাসে যারা বাইরে থেকে আসেন তাদের কাছ থেকে টাকা পয়সা ছিনতাই নিয়মিত ঘটনা। আরও অনেক অপকর্ম এখানে হয়। হলের সিট ভাড়া দেয়া হয় বাইরের লোকজনের কাছে। অনেকের এটা ব্যবসা।  আবার পাস করার পরও ছাত্রলীগ নেতারা হলে থাকেন। তাই তারা মনে করেছেন এত কিছু করে যদি পার পাওয়া যায় তাহলে ধর্ষণ করলে কী হবে?’

 ‘তারা ক্ষমতার কারণেই এবং আগে কোনো শাস্তি না হওয়ায় এই কাজ করতে সাহসী হয়েছে,’ বলেন এই শিক্ষার্থী।

জাঙ্গীরনগর বিশববিদ্যলয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান লিটন বলেন,’আমরা ঘটনার পরই ব্যবস্থা নিয়েছি। এটা ব্যক্তির দায়। আর ছাত্রলীগের পরিচয়ে কেউ কিছু করলে তার দায় তো ছাত্রলীগ নেবে না।’ ক্যাম্পাসে সিট ভাড়াসহ আরো অনেক অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন,’যারা এখন আর ছাত্রলীগে নেই, পাস করে গেছেন। তারপরও হলে থাকলে তার দায় কে নেবে? তারা কীভাবে থাকেন আমরা জানি না।’

এটা এক ধরনের ক্ষমতার প্রকাশ

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ফারুখ ফয়সাল বলেন, ‘এইরকম ধর্ষণের সাথে ক্ষমতার সম্পর্ক আছে। একটা হলো পুরুষ শাসিত সমাজে পুরুষের ক্ষমতা। আর তার সঙ্গে ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থাকলে সাহস আরও বেড়ে যায়। বেপরোয়া হয়ে যায়। কোনো অপরাধ করলে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে দায় এড়ানো হয়।  কিন্তু কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। এমসি কলেজের ঘটনায় হয়নি। আরও অনেক ঘটনায় হয়নি। ফলে তারা বেপরোয়া হয়ে গেছে।’

‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা দলীয়ভাবে দায় অস্বীকার করার ফল। তারা মনে করে দলের কোনো দায় নেই। ওখানে তাদের অপকর্মের অভয়ারণ্য তৈরি হয়েছিলো। তারা ক্ষমতার কারণে নিজেদের ধরাছোয়ার বাইরে মনে করে।’

আর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ঘটনা ঘটেছে আমি মনে করি তার কারণ ছাত্র রাজনীতিতে নেতিবাচক উপাদানের অনুপ্রবেশ যেমন সত্য তেমনি এটাকে শুধু দলীয়ভাবে না দেখে বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে বাংলাদেশে নারীর সার্বিক সুরক্ষায় কাজ করা প্রয়োজন।’

সূত্র: ডয়চে ভেলে

 

 

 

 

 

 


এনএনবিডি ডেস্ক:

মন্তব্য করুন