ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ
  • অমর একুশে বইমেলা চলবে ১৭ মার্চ পর্যন্ত**
  • টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে তিনটি ট্রাকের সংঘর্ষে ১ জন নিহত
  • গাইবান্ধায় পুলিশের সাথে বিএনপি’র ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া
  • ঘোষণা ছাড়াই বন্ধ পাসপোর্ট কার্যক্রম, ভোগান্তিতে মানুষ

মু. রাজিফুল হাসান

২ মার্চ ২০২২, ১১:০৩

রাসুল (সা.)-এর ইসরা ও মি'রাজ

25828_223.JPG
নবুয়্যতের দশম বছরে পদার্পণ করেছেন আল্লাহ রাসুল (সা.)। ইতিমধ্যে ঠাট্টা-বিদ্রুপ আর জুলুম-নিপীড়ন সয়ে কারাবরণের পর মুক্ত হয়েছেন তিনি। নির্যাতন আর কারাবরণের এই অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে সাহাবীদের ঈমানও একধাপ সমৃদ্ধ হয়ে গেল। এখন কুরাইশদের গণ্ডি পেরিয়ে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়েছে পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহে (এলাকায়)। এমনি এক সময়ে আল্লাহ তার রাসূলকে (সা.) কিছু নিদর্শন দেখাতে চাইলেন। এতদিন যাবৎ না দেখেও সেই সর্বশক্তিমান আল্লাহ ও তার ঘোষিত জান্নাত-জাহান্নাম আর নবীগণের কথা বর্ণনা করে একত্ববাদের দাওয়াত প্রচার করে আসছেন নবী মুহাম্মদ  (সা.)।  এবার আল্লাহ তার প্রিয় হাবীবকে তারই সৃষ্টি জগতের কিছু গোপন রহস্য দেখাতে নিয়ে গেলেন বায়তুল মাকদিস অতঃপর ঊর্ধ্বাকাশে।
 
সেই যাত্রার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন: "আমি হাযরে আসওয়াদের কাছে ঘুমিয়ে ছিলাম। জিবরীল আমীন এসে আমাকে চিমটি কাটলেন। আমি উঠে বসলাল, তবে কোনো কিছু দেখতে না পেরে শুয়ে পড়লাম। তিনি আবার এসে আমাকে চিমটি কাটলেন। আমি আবার উঠে বসলাম, তবে কোনো কিছু দেখতে না পেয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। জিবরীল আমীন তৃতীয়বার এলেন এবং পুনরায় আমাকে চিমটি কাটলেন। এবার আমি উঠে বসতেই তিনি আমার বাহু ধরে টান দিলেন। তিনি আমাকে একটি জন্তুর (বুরাক) উপর সওয়ার করালেন। জন্তুটি ছিল সাদা বর্ণের আর আকারে খচ্চর হতে ছোট ও গাধা হতে বড়। এর দুই উরুতে ছিল দুটি পাখা। এই পাখার সাহায্যে সে (পেছন পা) সঞ্চালন করে। আর সামনের পা দুটি সে দৃষ্টিসীমার শেষ প্রান্তে গিয়ে রাখে। এভাবে জিবরীল আমীন আমাকে নিয়ে রওনা হলেন। আমরা এমন ভাবে পাশাপাশি চলছিলাম যেন কেউ কাউকে হারিয়ে না ফেলি।" (ইবনে হিশাম ১০১ পৃষ্ঠা)
 
তবে অন্য এক বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: “(রওনা হবার আগে)  জিব্রীল (আ.) আমার বক্ষ বিদীর্ণ করে হৃদপিণ্ড বের করলেন। তারপর আমার নিকট একটি সোনার পাত্র আনা হল যা ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। এরপর আমার হৃদপিন্ডটি ধৌত করা হল এবং ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ করে যথাস্থানে আবার রেখে দেয়া হল।” (সহিহ বুখারী হাদিস নং ৩৮৮৭, ই.ফা. ৩৬০৫)
 
ইবনে মাসউদ বলেন: "আল্লাহ রাসুল  (সা.) ও জিবরীল আমীন যখন চলতে লাগলেন তখন আকাশ ও পৃথিবীর অসংখ্য নিদর্শন তাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। এভাবেই চলে বাইতুল মাকদিসে গিয়ে  যাত্রাবিরতি করেন তারা। রাসুল (সা.) সেখানে নবীদের একটি বিরাট সমাবেশ দেখতে পেলেন। তাদের মধ্যে হযরত ইব্রাহিম (আ.) , মূসা (আ.) ও ইসা (আ.) উপস্থিত ছিলেন। অতপর রাসুলুল্লাহর সা. ইমামতিতে সবাই নামাজ আদায় করলেন।” (ইবনে হিশাম ১০০ পৃষ্ঠা)
 
অতঃপর জিবরীল আমীনের সাথে প্রথম আসমানের দরজায় পৌঁছান আল্লাহ রাসুল  (সা.)। এ সময় আল্লাহর রাসূল  (সা.) বুরাকে চড়ে গিয়েছিলেন নাকি সিঁড়িতে করে উঠেছিলেন এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে ইবনে কাসীরের মতে, “বাইতুল মাকদিসের পর্ব শেষ করে ঊর্ধ্বারোহনের  জন্য বাহন প্রস্তুত করা হয়। আর এটি ছিল একটি সিঁড়ি বিশেষ। সেটিতে চড়ে রাসুল (সা.) আকাশে উঠলেন। এসময় বুরাকটি বাইতুল মাকদিসের দরজায় বাধা ছিল ভ্রমণ শেষে মক্কায় ফিরে আসার জন্য।” (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, তৃতীয় খন্ড ২১৪ পৃষ্ঠা)
 
এছাড়াও সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনায় ইবনে হিশাম উল্লেখ করেন রাসুলুল্লাহ সা. বলেন: “বাইতুল মাকদিসের অনুষ্ঠান সমাপ্ত হলে আমার সামনে ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণের সিঁড়ি হাজির করা হল। এমন সুন্দর কোন জিনিস আমি আর কখনো দেখিনি। মৃত্যুর সময় হলে মানুষ এই সিঁড়ির দেখতে পাই এবং এর দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে। জিবরীল আমীন আমাকে ওই সিঁড়িতে আরোহন করালেন এবং আমাকে সাথে নিয়ে আকাশের একটি দরজায় গিয়ে থামলেন।” (ইবনে হিশাম ১০২ পৃষ্ঠা)
 
অতপর আসমানসমূহে ভ্রমন করেন আল্লাহর রাসুল (সা.)। এ বিষয়ে রাসুল  (সা.) বলেন: “আমাকে নিয়ে জিবরীল আমীন চললেন। প্রথম আসমানে নিয়ে এসে দরজা খুলে দিতে বললেন। (ভেতর থেকে) রক্ষক জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কে?’ তিনি বললেন, ‘আমি জিবরীল।’ আবার জিজ্ঞেস করা হল, ‘আপনার সঙ্গে কে?’ তিনি বললেন, ‘মুহাম্মাদ  (সা.)।’ আবার জিজ্ঞেস করা হল, ‘তাকে কী ডেকে পাঠানো হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘হাঁ।’ তখন বলা হল, ‘মারহাবা, উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে।‘
 
তারপর আসমানের দরজা খুলে দেয়া হল এবং আমরা তাতে প্রবেশ করলাম। তখন দেখি সেখানে এমন এক ব্যক্তি উপবিষ্ট রয়েছেন যার ডান ও বাম পাশে রয়েছে অনেকগুলো মানুষের আকৃতি। যখন তিনি ডান দিকে তাকান তখন হেসে উঠেন আর যখন বাম দিকে তাকান তখন কাঁদেন। অতঃপর তিনি বললেন, ‘স্বাগতম ওহে সৎ নবী ও সৎ সন্তান।’
 
আমি জিবরীলকে (আ.) বললাম, ‘কে এই ব্যক্তি?‘ তিনি বললেন, ‘ইনি হচ্ছেন আদম (আ.)। আর তার ডানে বামে রয়েছে তার সন্তানদের রূহ। তার মধ্যে ডান দিকের লোকেরা জান্নাতী আর বাম দিকের লোকেরা জাহান্নামী। ফলে তিনি যখন ডান দিকে তাকান তখন হাসেন আর যখন বাম দিকে তাকান তখন কাঁদেন।” (সহিহ বুখারী হাদিস নং ৩৮৮৭, ই.ফা. ৩৬০৫; সহিহ বুখারী হাদিস নং ৩৪৯, ই.ফা. ৩৪২)
 
আল্লাহ রাসুল  (সা.) বলেন: “অতঃপর কিছু লোক দেখলাম, যাদের ঠোঁট উটের ঠোঁটের মতো এবং তাদের হাতের মুঠোয় দগদগে উজ্জ্বল ছোট ছোট পাথর টুকরা রয়েছে। পাথরগুলো তারা মুখে দিচ্ছে আবার পরক্ষণেই তা মলদ্বার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'হে জিবরীল, এরা কারা?' তিনি বললেন, 'এরা ইয়াতিমের সম্পদ আত্মসাকারী।'
 
তারপর আরো কিছু লোক দেখলাম, যাদের পেটের মত বীভৎস আকৃতির পেট আমি আর কখনো দেখিনি। ফেরাউনের সহযোগীদের যে পথ দিয়ে জাহান্নামে নেয়া হচ্ছে সেই পথের উপর তারা অবস্থান করছে। তারা পিপাসায় কাতর উটের মতো ছটফট করছে। আর ফেরাউনের জাহান্নামী অনুসারীরা তাদেরকে পায়ের তলায় পিষ্ট করে চলেছে। তথাপি সেই অবস্থান থেকে তারা একটুও  সরতে পারছে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'হে জিবরীল, এরা কারা?' তিনি বললেন, 'এরা সুদখোর।'
 
অতঃপর আরো একদল লোক দেখলাম, যাদের সামনে উৎকৃষ্টমানের খাবার রয়েছে। আর তার পাশেই রয়েছে দুর্গন্ধযুক্ত খাবার। তারা ভালো খাবার বাদ দিয়ে খারাপ খাবার খাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'হে জিবরীল, এরা কারা?' তিনি বললেন, 'এরা সেই সব লোক যারা বৈধ স্ত্রী থাকতে নিষিদ্ধ (অবৈধ) স্ত্রী লোকের কাছে যায়।'
 
অতঃপর কিছু সংখ্যক নারীকে দেখলাম যাদের স্তনে রশি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'হে জিবরীল, এরা কারা?' তিনি বললেন, 'এরা সেই সব নারী যারা ব্যাভিচারের মাধ্যমে অন্যের সন্তান স্বামীর সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।” (ইবনে হিশাম ১০৩-১০৪ পৃষ্ঠা)
 
আল্লাহ রাসুল (সা.) বলেন: “অতঃপর জিবরীল আমীন আমাকে নিয়ে দ্বিতীয় আসমানে উঠলেন। অতঃপর তার রক্ষককে বললেন, ‘দরজা খোল।’ তখন এর রক্ষক প্রথম রক্ষকের মতই প্রশ্ন করলেন। পরে দরজা খুলে দেয়া হল। সেখানে প্রবেশ করে ইয়াহ্‌ইয়া (আ.) ও ঈসা (আ.) - এর সাক্ষাৎ পেলাম। তারা দু’জন ছিলেন পরস্পরের খালাত ভাই। জিবরীল বললেন, ‘এরা হলেন, ইয়াহ্‌ইয়া ও ঈসা (আ.)। তাদের প্রতি সালাম করুন।” তখন আমি সালাম করলাম। তাঁরা জবার দিয়ে বললেন, ‘নেক্‌কার ভাই ও নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ আমদেদ।’
 
এরপর জিবরীল আমীন আমাকে নিয়ে তৃতীয় আসমানের দিকে চললেন। সেখানে পৌঁছে জিবরীল রক্ষককে বললেন, ‘দরজা খোল।’ তখন এর রক্ষক প্রথম রক্ষকের মতই প্রশ্ন করলেন। পরে দরজা খুলে দেয়া হল। আমি তথায় প্রবেশ করে ইউসুফ (আ.) - কে দেখতে পেলাম। জিবরীল বললেন, ‘ইনি ইউসুফ (আ.), আপনি তাঁকে সালাম করুন।’ আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি জবাব দিলেন এবং বললেন, ‘নেক্‌কার ভাই, নেক্‌কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ।’
 
এরপর জিবরীল আমীন আমাকে নিয়ে উপর দিকে চললেন এবং চতুর্থ আসমানে পৌঁছলেন। অতঃপর জিবরীল তার রক্ষককে বললেন, ‘দরজা খোল।’ তখন এর রক্ষক প্রথম রক্ষকের মতই প্রশ্ন করলেন। পরে দরজা খুলে দেয়া হল। আমি ইদ্রীস (আ.) - এর কাছে পৌঁছলে জিবরীল বললেন, ইনি ইদ্রীস (আ.)। তাকে সালাম করুন। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনিও জবাব দিলেন। তারপর বললেন, ‘মারহাবা ওহে নেককার ভাই ও পুণ্যবান নবী।’
 
এরপর জিবরীল আমীন আমাকে নিয়ে উপর দিকে গিয়ে পঞ্চম আসমানে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন। তখন এর রক্ষক প্রথম রক্ষকের মতই প্রশ্ন করলেন। পরে দরজা খুলে দেয়া হল। আমি তথায় প্রবেশ করে হারূনকে (আ.) দেখতে পেলাম। জিবরীল বললেন, ‘ইনি হারূন (আ.), তাকে সালাম করুন। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি জবাব দিলেন এবং বললেন, ‘মারহাবা ওহে নেককার ভাই ও পুণ্যবান নবী।’
এরপর আমাকে নিয়ে যাত্রা করে ষষ্ঠ আকাশে পৌঁছে দরজা খুলতে বললেন জিবরীল। তখন এর রক্ষক প্রথম রক্ষকের মতই প্রশ্ন করলেন। পরে দরজা খুলে দেয়া হল। তথায় পৌঁছে আমি মূসাকে (আ.) দেখতে পেলাম। জিবরীল (আ.) বললেন, ‘ইনি মূসা (আ.), তাঁকে সালাম করুন। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি জবাব দিলেন এবং বললেন, ‘মারহাবা ওহে নেককার ভাই ও পুণ্যবান নবী।’
 
এরপর আমি যখন অগ্রসর হলাম তখন মূসা (আ.) কেঁদে ফেললেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘আপনি কিসের জন্য কাঁদছেন?’ তিনি বললেন, ‘আমি এজন্য কাঁদছি যে, আমার পর একজন যুবককে নবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, যাঁর উম্মত আমার উম্মত হতে অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে।’
 
অতপর পর জিবরীল (আ.) আমাকে নিয়ে সপ্তম আকাশের দিকে গেলেন এবং দরজা খুলে দিতে বললেন। তখন এর রক্ষক প্রথম রক্ষকের মতই প্রশ্ন করলেন। পরে দরজা খুলে দেয়া হল। আমি সেখানে পৌঁছে ইব্‌রাহীমকে (আ.) দেখতে পেলাম। জিবরীল অমীন বললেন, ‘ইনি আপনার পিতা, তাকে সালাম করুন। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি সালামের জবার দিলেন এবং বললেন, ‘মারহাবা ওহে নেককার পুত্র ও পুণ্যবান নবী।” (সহিহ বুখারী হাদিস নং ৩৮৮৭, ই.ফা. ৩৬০৫; সহিহ বুখারী হাদিস নং ৩৪৯, ই.ফা. ৩৪২)
 
আল্লাহ রাসুল সা. বলেন: “তারপর আমাকে সিদরাতুল মুনতাহা*১ পর্যন্ত উঠানো হল। দেখতে পেলাম সেখানকার ফল ‘হাজার‘ অঞ্চলের মটকার ন্যায় এবং পাতাগুলি হাতির কানের মত। আমাকে বলা হল, ‘এ হল সিদরাতুল মু্‌নতাহা।’ সেখানে আমি চারটি নহর দেখতে পেলাম, যাদের দুটি ছিল অপ্রকাশ্য আর দুটি ছিল প্রকাশ্য। তখন আমি জিবরীলকে (আ.) জিজ্ঞেস করলাম, ‘এ নহরগুলি কি?’ তিনি বললেন, ‘অপ্রকাশ্য দুটি হল জান্নাতের দুটি নহর। আর প্রকাশ্য দুটি হল নীল নদী ও ফুরাত নদী।’
 
তারপর আমার সামনে ‘আল-বায়তুল মামুর‘*২ প্রকাশ করা হল। এরপর আমার সামনে একটি শরাবের পাত্র, একটি দুধের পাত্র ও একটি মধুর পাত্র রাখ হল। আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। তখন জিবরীল বললেন, ‘এ-ই হচ্ছে ফিতরাত। আপনি ও আপনার উম্মতগণ এর উপর প্রতিষ্ঠিত।” (সহিহ বুখারী হাদিস নং ৩৮৮৭, ই.ফা. ৩৬০৫)
 
[টিকা-১: ‘সিদরা’ শব্দের অর্থ কূল বৃক্ষ এবং ‘মুনতাহা’ শব্দের অর্থ শেষসীমা। পৃথিবী হতে উর্ধ্বলোকে নীত হয় তা ওখানে গিয়েই থেমে পড়ে, অতঃপর তার অপর পাড়ে যাঁরা রয়েছেন তারা সেখান হতে তা গ্রহণ করে উপরে নিয়ে যান। শেষ সীমায় চিহ্নস্বরূপ ঐ স্থানটাতে একটা কূল বৃক্ষ থাকায় ঐ সীমান্ত চিহ্নকে ‘সিদরাতুল মুনতাহ’ বলা হয়। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩৮৮৭, ই.ফা. ৩৬০৫)
 
টিকা-২: বাইতুল মামুর হলো সপ্তম আসমানে অবস্থিত একটি মসজিদ। যেখানে প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে এবং তারা আর ফিরে আসে না। এভাবে কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে। এর মাধ্যমে ফেরেশতাদের সংখ্যা যে অগণিত তা অনুধাবন করা যায়। (ইবনে হিশাম ১০৪ পৃষ্ঠা)]
 
আল্লাহ রাসুল (সা.) বলেন: “অতঃপর আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হল। আমি দেখতে পেলাম  তাতে রয়েছে মুক্তোমালা আর তার মাটি হচ্ছে কস্তুরী। সেখানে ঈষৎ কালো ঠোঁট বিশিষ্ট এক পরমা সুন্দরী যুবতীকে দেখলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি কার জন্য?' সে বলল, 'যায়েদ ইবনে হারিসার জন্য।" (সহিহ বুখারী হাদিস নং ৩৪৯, ই.ফা. ৩৪২; ইবনে হিশাম ১০৪ পৃষ্ঠা)
 
সিদরাতুল মুনতাহা ছিল সপ্তম আকাশের শেষ প্রান্তের একটি স্থান। আর এই স্থানটি হলো জিবরীল আমীন গমনের শেষ সীমানা। এর উপরে ওঠা জিবরীলের জন্য অনুমতি ছিল না। অতঃপর আল্লাহ তার রাসূলকে (সা.) আরো উপরে উঠালেন এবং উনার উম্মতের জন্য নামাজ ফরজ করে দেন।
 
এ বিষয়ে আল্লাহ রাসুল (সা.). বলেন: “অতঃপর আমাকে আরো উপরে উঠানো হল। অতঃপর এমন এক সমতল স্থানে এসে আমি উপনীত হই যেখানে আমি লেখার শব্দ শুনতে পাই। আল্লাহ আমার উম্মাতের উপর ৫০ ওয়াক্ত সালাত ফরয করে দেন। অতঃপর তা নিয়ে আমি ফিরে আসি।” (সহিহ বুখারী হাদিস নং ৩৪৯, ই.ফা. ৩৪২; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, তৃতীয় খন্ড ২১৫ পৃষ্ঠা)
 
ফেরার পথে হযরত মূসার (আ.) সাথে দেখা হয় রাসুলুল্লাহর(সা.)। এসময় হযরত মূসার (আ.) বললেন: “আল্লাহ তাআলা আপনার উম্মাতের উপর কী ফরয করেছেন?” রাসুল (সা.) : “পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন।” মূসার (আ.) : “মানুষ সম্পর্কে আপনার চেয়ে আমি বেশী জানি। আমি বনি ইসরাইলকে কঠিনভাবে পরীক্ষা করেছি। আপনি আপনার পালনকর্তার নিকট ফিরে যান এবং বলুন। কেননা আপনার উম্মাত তা পালন করতে পারবে না “রাসুল (সা.)তখন আল্লাহর কাছে ফিরে গেলেন এবং কমিয়ে দেয়ার কথা বললেন। আল্লাহ তাআলা কমিয়ে তা ৪০ ওয়াক্ত করে দিলেন।  অতপর রাসুল (সা.)মূসার (আ.) নিকট গিয়ে তা জানালে মূসার (আ.) পুনরায় যাওয়ার কথা বলেন। রাসুল (সা.)তাই করলেন। তখন আল্লাহ তাআলা কমিয়ে তা ৩০ ওয়াক্ত করে দিলেন।  অতঃপর অনুরূপ ঘটে, ফলে ২০ ওয়াক্ত করে দেন। অতঃপর অনুরূপ ঘটে, ফলে ১০ ওয়াক্ত করে দেন। অতঃপর অনুরূপ ঘটে, ফলে তা ৫ ওয়াক্ত করে দেয়া হয়।

অতপর রাসুল (সা.) মূসার (আ.) নিকট গেলে তিনি বললেন: “কি করেছ?” রাসুল (সা.)বললেন “পাঁচ ওয়াক্ত করে দিয়েছেন।” তখন মূসার (আ.) আবারো অনুরূপ বললে রাসুল (সা.)বললেন: “আমি আমার রবের নিকট আরজি করতে লজ্জাবোধ করছি। আর আমি এতেই সন্তুষ্ট হয়েছি এবং তা মেনে নিয়েছি।”
 
এরপর রাসুল (সা.) অগ্রসর হলেন। তখন এক ঘোষণাকারী ঘোষণা দিলেন, “নিশ্চয় আমি আমার ফরয জারি করে দিলাম এবং আমার বান্দাদের উপর হালকা করে দিলাম। আমি এক নেকির প্রতিদান দিব দশ।” (সহিহ হাদিসে কুদসি, হাদিস নং ৯৪; সহিহ বুখারী হাদিস নং ৩৪৯, ই.ফা. ৩৪২; সহিহ বুখারী হাদিস নং ৩৮৮৭, ই.ফা. ৩৬০৫)
 
অতঃপর আল্লাহ রাসূলকে (সা.) মক্কায় ফিরিয়ে আনা হয়। পরদিন সকালে কুরাইশী লোকদের নিকট রাতের মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করেন আল্লাহ রাসুল (সা.)। এ ঘটনা শুনে অধিকাংশ লোকজন বলল: "আল্লাহর শপথ, এটি এক আজগুবি ও অবিশ্বাস্য কাহিনী। মক্কা থেকে সিরিয়ায় কাফেলা যেতে একমাস এবং ফিরে আসতে একমাস সময় লাগে। আর এত লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে মুহাম্মদ কিনা এক রাতেই সেখানে গেল, আবার মক্কায় ফিরে এলো!" (ইবনে হিশাম ১০১ পৃষ্ঠা)
 
মিরাজের বর্ণণা শুনে কিছু দুর্বল মুসলমান ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়। এসময় কুরাইশদের দুষ্ট লোকেরা আবু বকরের রা. কাছে গিয়ে বললো: "তোমার বন্ধুকে কী বলছে তুমি বিশ্বাস করো? সে বলছে, সে নাকি গতরাতে বাইতুল মাকদিস গিয়েছিল এবং সেখানে নামায পড়েছে অতঃপর মক্কায় ফিরে এসেছে।" আবু বকর রা. বললেন: "আল্লাহর শপথ! তিনি যদি এ কথা বলে থাকেন, তবে অবশ্যই সত্য কথা বলেছেন। এতে তোমরা আশ্চর্য হওয়ার কী দেখলে? তার কাছে তো আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত মুহূর্তের মধ্যেই আল্লার ওহী আসে। আর সে বিষয়ের উপরও আমার বিশ্বাস আছে। তোমরা যে ঘটনা নিয়ে চোখ কপালে তুলছো এর চেয়েও এটা বিস্ময়কর।"
 
অতঃপর আল্লাহর রাসূলের (সা.) কাছে গিয়ে মিরাজের বিষয়ে অবহিত হন আবু বকর রা.। অতপর বললেন: "হে আল্লাহর রাসুল, বাইতুল মাকদিসের আকৃতি কেমন আমাকে বলুন। কেননা বাইতুল মাকদিস আমি গিয়েছি।"এ সময় আল্লাহর রাসূলের (সা.)সামনে বাইতুল মাকদিস তুলে ধরা হল এবং তিনি তার দিকে তাকিয়ে এর বর্ণনা করতে লাগলেন। রাসুলের সা. বর্ণনা শুনে আবু বকর রা. বললেন: "আপনি ঠিক বলেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল।"এসময় আল্লাহ রাসূল সা. বললেন: "হে আবু বক্কর, তুমি সিদ্দীক।" সেদিন থেকেই আবু বকর রা. সিদ্দীক উপাধিতে ভূষিত হন। (ইবনে হিশাম ১০১-১০২ পৃষ্ঠা)
 
আল্লাহ সুবহানাতায়ালা বিভিন্ন সময় নবীদের তার নিদর্শন দেখানোর মাধ্যমে তাদেরকে আয়নাল ইয়াকিন অর্থাৎ স্বচক্ষে দেখার মর্যাদায় উপনীত করেছিলেন। যার ফলে নবুয়তের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা সকল প্রকার জুলুম-নিপীড়ন ও দুঃখ-কষ্ট সয়ে গিয়েছিল, যা সাধারণ মানুষদের পক্ষে সম্ভব নয়।
 
আর মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর (সা.) ক্ষেত্রে মিরাজের এই ঘটনা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে আইনাল ইয়াকিনের মর্যাদায় উপনীত করা। এছাড়াও যেসকল সাহাবীরা এতদিন  যাবত নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে নিজেদের ঈমানের পরীক্ষায় জ্বালাই করেছিলেন, তাদের জন্য এই আকস্মিক ঘটনাটি ছিল নতুন এক পরীক্ষা। দেখা যায় অনেকেই জুলুম-নিপীড়নের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও এই আকস্মিক ঘটনা বিশ্বাসের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ফলে ইসলাম ছেড়ে হয়ে গিয়েছিলেন মুরতাদ।
 
সামগ্রিক দিক বিবেচনায় রাসুলুল্লাহর (সা.). জীবনের অধ্যায় থেকে উম্মাহর জন্য এই মূলনীতি গ্রহণ করা যায় যে, "দ্বীনে জন্য জুলুম-নিপীড়ন সহ্য করার চাইতেও আল্লাহ ও তার রাসূলের (সা.) ঘোষিত সকল বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করা অত্যাবশ্যকীয়। একটাই ঈমানের মূল এবং পরকালীন সফলতার চাবিকাঠি।"

মু. রাজিফুল হাসান
- লেখক ও গবেষক