ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ
  • অমর একুশে বইমেলা চলবে ১৭ মার্চ পর্যন্ত**
  • টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে তিনটি ট্রাকের সংঘর্ষে ১ জন নিহত
  • গাইবান্ধায় পুলিশের সাথে বিএনপি’র ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া
  • ঘোষণা ছাড়াই বন্ধ পাসপোর্ট কার্যক্রম, ভোগান্তিতে মানুষ

আহসান ইব্রাহিম

১ মার্চ ২০২২, ১৩:০৩

ইতিহাসের পরতে ঢাকাই ঈদ

25794_283.jpg
ঈদ মুসলিমদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও ঢাকার উদযাপন কেমন ছিল অতীতে তা ইতিহাস ঘাটলে বৈচিত্রময় তথ্য পাওয়া যায়। সেই মোঘলদের আমল থেকে এই শহরে ঈদ উৎসব পালিত হচ্ছে। মোঘলদের আগমনের পূর্বে বাংলায় মুসলিমদের আনাগোনা যথেষ্ট কম ছিলো। কিন্তু ১৬১০ সালে সুবেদার ইসলাম খানের আমল থেকে এই বাংলায় মুসলমানদের আগমন বাড়তে থাকে।

মুসলমানদের সবচেয়ে প্রিয় এবং প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ। পৃথিবীর সব মুসলমান সারা বছর ধরে অপেক্ষা করতে থাকেন এই দিনটির জন্য। পুরো রমজান মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে ঈদের পবিত্রতাকে ধরে রাখেন পৃথিবীর সব মুসলমান। পৃথিবীর সব দেশেই ঈদের দিনটি আনন্দের সঙ্গে পালন করেন মুসলমানরা।

মোঘলদের আগে বাংলায় ঈদের প্রচলন স্বল্পপরিসরে বা ইবাদাত বন্দেগী নির্ভর। মোঘল সম্রাটদের শাসনামল থেকেই বৃহৎ পরিসরে বা আড়ম্বরপূর্ণভাবে ঈদ পালন করার সুযোগ পান মুসলিমরা। মোঘলদের ঈদ উদযাপনের ইতিহাস এবং বর্তমান যুগে তার প্রভাব নিয়ে অনেকের অনেক মতভেদ। তবে ইতিহাস থেকে জানা যায় মোঘলদের মাধ্যমেই মূলতঃ বাংলায় আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদ উজযাপন শুরু হয়।

প্রাচীন ইতিহাস: সমগ্র মুসলিম দুনিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসবের নাম ঈদুল ফিতর। আগে ঈদুল ফিতর উল্লেখিতভাবে পালন না করার পেছনে কিছু কারণ খুঁজে বের করেন বিশিষ্ট লেখক মুনতাসির মামুন। তার কথা মতে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসিত তখনকার সমাজে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসব বড়দিনকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হতো। খুব ধুমধাম করে পালন করা হতো বড়দিন বা ক্রিসমাস। এই দিনে সরকারি ছুটিরও ব্যবস্থা ছিল। কলকাতার বাইরে মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলের মানুষের সঙ্গে যদিও এই অনুষ্ঠানের কোনো যোগসূত্র ছিল না। তখন উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানের সমপরিমাণ খ্রিস্টানও ছিল। আর ব্রিটিশদের শাসনামল ছিল বিধায় খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসবগুলোই পালন করা হতো। সে সময় খুব জমকালোভাবে হিন্দু ধর্মের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজা পালন করা হতো। মুসলমানরা ছিল সংখ্যালঘু। তাই তাদের ধর্মীয় উৎসবের মর্যাদাও ছিল কম। ঈদের ছুটির তুলনায় পূজার ছুটি ছিল বেশি। ঈদের ছুটি বাড়ানোর আবেদন করলেও খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি সে তৎকালীন ইসলামের অনুসারীরা।

পূর্বে ঈদকে কেন্দ্র করে গ্রাম্য নিম্নবিত্ত মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে হালকা আনন্দ-উৎসবের ব্যবস্থা করত। তাছাড়া তখন সাধারণ মানুষের ধর্ম এবং ধর্মীয় উৎসব সম্পর্কে জানা ছিল খুব কম। মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসেবে ঈদ উদযাপিত না হওয়ার পেছনে আরেকটি বিশেষ কারণ ছিল; তা হলো বিশুদ্ধ ইসলাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা। এসব ক্ষেত্রেও মোঘলদের অনেক বড় অবদান রয়েছে। মোঘলরা প্রত্যেক প্রদেশে মক্তব গড়ে তুলেছিলেন সঠিক কোরআন ও ইসলামী আইন শিক্ষা দেয়ার জন্য। সেই চার শ’-পাঁচ শ’ বছর আগে উপমহাদেশে ইসলাম ধর্মকে সঠিক রূপে প্রচার করেন মোঘলরাই।

মোঘলদের পৃষ্ঠপোষকতা: মোঘল আমলে ভারতে ঈদের দিনের ইতিহাস সম্পর্কে লেখা পাওয়া গেছে বিভিন্ন বইপত্রে। সে সময় ঈদ এবং ঈদের অনুষ্ঠানকে সরকারিভাবে গুরুত্ব দেয়া হতো। মোঘল সম্রাজ্যে যেসব অনুষ্ঠান হতো সেসব অনুষ্ঠানের আবার চিত্রাঙ্কনও করা হতো। সে আমলের বিভিন্ন চিত্রে ফুটে ওঠে সে সময়ের উৎসবের ঘনত্ব বা পরিসর।

মোঘলরা বাংলায় আধিপত্য বিস্তারের পর জীবন ব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম অনেক এগিয়ে যায়। ভারতের উত্তরাঞ্চল থেকে আগত মোঘলরা ইসলাম সম্পর্কে অনেক বেশি জানতেন। কিন্তু তারা বিশুদ্ধ ধর্ম পালনে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। ঈদ মানেই খুশি, বলা আছে ইসলাম ধর্মে। তাই তখন মোঘলরা রমজানের প্রথম থেকেই চেষ্টায় থাকত তাক্বওয়া অর্জন ও ঈদের খুশিকে আয়ত্ত করে নিতে। কিন্তু এসব আনন্দ সীমাবদ্ধ ছিল শুধু উচ্চবিত্ত মোঘলদের মধ্যে। তার মানে এই নয় যে, নিম্নবিত্তদের আনন্দ-উৎসবের ব্যবস্থা ছিল না। নিঁচু শ্রেণির মুসলমানদের জন্যও আনন্দ-উৎসবের সুব্যবস্থা করেছিলেন তখনকার মোঘল অধিপতিরা।

মোঘলরা ঢাকায় আসায় উৎসব হিসেবে ঈদ পালন করা হতে থাকে। দিল্লি থেকে এত দূরে উৎসব করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে চাইতেন না মোঘলরা। ফলে ঈদ উদযাপনটা হয়ে ওঠে অধিক আনন্দময়। মোঘলদের ঈদ উদযাপন হতো দু-তিন দিন ধরে। চলত সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন। আত্মীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন নিয়ে একরকম মেলাই বসে যেত। তখনকার ঈদ উদযাপনের চিত্র পাওয়া যায় সুবেদার ইসলাম খানের সেনাপতি মির্জা নাথানের বর্ণনা থেকে।

শাহ সুজা শিয়া মতাবলম্বী হওয়ায় তিনি ঢাকায় আসার সময় সঙ্গে করে নিয়ে আসেন তিন শ’ শিয়া পরিবার। এদের আগমনে ঢাকার অভিজাত শ্রেণির সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পায়। তাদের কল্যাণে সাংস্কৃতিকভাবে ঢাকা আরো মার্জিত হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ধরে নেয়া যায় ঈদ উদযাপনেও আরো চাকচিক্যের সংযোজন ঘটে। এসব উৎসবে ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের উপস্থিতি থাকত না বললেই চলে। জানা গেছে, দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলি খাঁর সময় জয় করা হয়েছিল ত্রিপুরা। তখন ঈদের দিন নবাব খুশি হয়ে গরিবদের মধ্যে এক হাজার টাকা বিতরণ করার আদেশ দেন। ঢাকার কেল্লা থেকে এক ক্রোশ দূরে ঈদগাহ যাওয়ার পথে রাস্তায় ছড়ানো হয়েছিল এই মুদ্রা। কিন্তু পরবর্তীতে ঈদের দিন এভাবে গরিবদের মধ্যে মুদ্রা বিতরণের কথা আর জানা যায়নি।

ঈদগাহ্: মোঘল আমলের সবচেয়ে বড় ঈদগাহের নিদর্শন এখনো দৃশ্যমান। ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজার প্রধান অমাত্য মীর আবুল কাসেম ধানমন্ডির শাহী ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকায় অবস্থিত মোঘল স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর অন্যতম এই ঈদগাহ্। পরে ঈদগাহটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয় এবং তাতে ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসল্লিরা আসতেন। ঈদগাহটি বর্তমানেও ঈদের নামাজের জন্য ব্যবহৃত হয়।

ঈদের নামাজ: মোঘল রাজারা ধর্মকর্ম করেছেন অনেক বেশি। ঈদের দিনের নামাজ তাদের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ঈদের নামাজ পড়ানোর জন্য রাজারা ইমাম নিয়োগ করতেন। শহরের বাইরের বিরাট উন্মুক্ত জায়গায় অথবা গ্রামে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হতো এবং এসব স্থানকে ঈদগাহ বলা হতো। তবে মহিলাদের জন্য কোনো ঈদ জামাতের ব্যবস্থা ছিল কিনা তা জানা যায়নি।

ঈদের শোভাযাত্রা: স্যার টমাস মেটকাফে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিভিল সার্ভেন্ট ছিলেন। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের কোর্টে কাজ করার কারণে মেটকাফে সম্রাটের প্রিয়ভাজন হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। বাহাদুর শাহ জাফর স্যার টমাস মেটকাফেকে দিয়ে ভারতের শিল্প-সংস্কৃতির ওপর জরিপ করান এবং সেগুলোর ওপর চিত্রাঙ্কন করার দায়িত্ব দেন। চমৎকার এই দায়িত্ব পেয়ে মেটকাফে অতি উৎসবের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। তিনি ভারতের শিল্পীদের সহযোগিতায় মুসলিম আর্কিটেকচারের ওপর গবেষণা ও চিত্রাঙ্কনের কাজ শুরু করেন। একে একে গুরুত্বপূর্ণ ইমারতগুলোর চিত্র অঙ্কন করেন। এরপর মোঘল আমলে ঈদকে কেন্দ্র করে যেসব অনুষ্ঠান হতো সেই অনুষ্ঠানেরও চিত্র অঙ্কনে অসাধারণ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। এমনই একটি চিত্রের নাম ‘ঈদের শোভাযাত্রা’।

ঢাকার ঈদ মিছিল: মোঘল আমলে ঢাকায় ঈদ মিছিল বলে একটা কথা ছিল। সে মিছিলে শামিল হতেন রাজধানীর অভিজাত শ্রেণির সর্বস্তরের। উনিশ শতকের প্রথমদিকে আলম মুসাওয়ার নামে এক শিল্পী ঢাকার ঈদ ও মহরমের মিছিলের ছবি এঁকেছিলেন। মোট ৩৯টি ছবি আঁকেন তিনি।
ঈদ মেলা: অনুমান করা হয় মোঘল আমলে বাদশাহি বাজারে অর্থাৎ বর্তমান চকবাজারে ঈদ মেলার আয়োজন হতো। বিশেষ করে তখনকার প্রশাসনিক সদর দফতর ঢাকা কেল্লার আশপাশের এলাকা ঈদের সময়টায় থাকত জমজমাট। চকবাজার এবং রমনা ময়দানের সেই ঈদ মেলায় বিভিন্ন রকমের বাঁশের তৈরি খঞ্চা ডালা আসত।

শাহী ভোজ: ঘরে শাহী খাবারের আয়োজন না হলে ঈদের খুশি যেন অপূর্ণই থাকে । মোঘল আমল থেকে শুরু করে আজ অব্দি ঈদের দিন সব মুসলিমের ঘরে ঘরেই রান্না হয় মুখরোচক সব শাহী রান্না। মোঘলদের রাজত্বকালে ঈদের দিন তৈরি হতো বিভিন্ন ধরনের শাহি খাবার। সকালের নাশতায় খাওয়া হতো বাকরখানি, পরোটা, মাংস আর কয়েক পদে রান্না করা শাহী সেমাই। দুপুরের খাবারে থাকত মোরগ পোলাও, কোরমা, পরোটা, কালিয়া, জর্দা। রাতেও এমন সব খাবারের আয়োজন করা হতো। মোঘলদের ঈদের সব রান্নায় মালাই ব্যবহার করা হতো। রাতের খাবারের সঙ্গে উচ্চবিত্ত মোঘলরা সুরা পান করতেও পছন্দ করতেন। এসব খাবার-দাবার মোঘল যুগে অভিজাত পরিবারদের মধ্যে ব্যাপক প্রচলিত ছিল। এছাড়া সেই আমলে মুসাফিরদের জন্য ঈদের খাবার-দাবারের বন্দোবস্ত করা হতো।

হালের ঈদে মোঘলদের প্রভাব: বর্তমানে ঈদ আর আগের মতো নেই। এখন আর মোঘল আমলের মতো ঈদ শোভাযাত্রা, ঈদ মিছিলে গিয়ে আনন্দ করার মতো সময় হয়ে ওঠে না সাধারণ মানুষের। তাই এসবের চাহিদাও নেই। সুতরাং বর্তমান যুগের ঈদে মোঘল আমলের প্রভাব প্রায় নেই বললেই চলে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরো নতুনত্ব আনা হয়েছে।কারণ ঈদের দিন উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত কম-বেশি সবার ঘরে ঘরে রান্না হয় শাহি খাবার। মোঘল আমলের মতো ঈদ এখন আর না হলেও রোজা এলেই শুরু হয়ে যায় ঈদের প্রস্তুতি। আর আনন্দ-উদযাপন ঈদের পর পর্যন্ত।