ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ
  • অমর একুশে বইমেলা চলবে ১৭ মার্চ পর্যন্ত**
  • টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে তিনটি ট্রাকের সংঘর্ষে ১ জন নিহত
  • গাইবান্ধায় পুলিশের সাথে বিএনপি’র ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া
  • ঘোষণা ছাড়াই বন্ধ পাসপোর্ট কার্যক্রম, ভোগান্তিতে মানুষ

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৮:০২

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার দাবি ও বাস্তবতা

25726_14.jpg
রাজনীতির ধারা ক্রমেই জটিল হচ্ছে । দেশ-বিদেশে সর্বত্রই এই চিত্র ক্রমশ ফুটে উঠছে। এখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় গড়াচ্ছে যে কোনো কোনো দেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ বহিঃদেশ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করছে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যের বিষয়গুলোও আজ বৈশ্বিক রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক ইউক্রেন সংকট থেকে তা প্রমাণিত হয়ে উঠছে। তবে শুধু ইউক্রেন নয়, গোটা বিশ্বরাজনীতির চিত্র এটি। খুব কম রাষ্ট্রই আছে যেখানে স্বদেশীয় রাজনীতিকরা দেশের রাজনীতির পুরো দখল রাখতে পারছেন।

বিশ্বব্যবস্থায় এমন একটি পরিবর্তন এসেছে যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকার প্রধান কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোকে বহিঃরাষ্ট্রের সাথে সমঝোতা কিংবা কোনো কোনো বিষয়ে ঐক্যমত বা সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হচ্ছে। ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য বা আঞ্চলিক প্রভাব বলয় তৈরি করাও থাকে এক ধরণের টার্গেট। এক্ষেত্রে সামরিক আধিপত্যও লক্ষ্যণীয় হচ্ছে সাম্প্রতিককালে।

বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের শাসন পদ্ধতি বা নির্বাচন প্রক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন হলেও সকলেই একটি জায়গায় একমত যে শাসনভার পরিবর্তন বা নির্ধারনের একমাত্র পদ্ধতি হচ্ছে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচন। এক্ষেত্রে কোনো গোষ্ঠীই দ্বিমত করছেন না। বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল ও আপামর জনগণও সেরকম চেতনাই লালন করে। তবে পৃথিবীর পরাশক্তি দেশগুলোতেও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা বা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ও অস্থিরতার ঘটনা ঘটেছে। একই রকম ঘটনা কিংবা তার চেয়ে গুরুতর পরিস্থিতি বাংলাদেশে লক্ষ্য করা গেছে গেল তিনটি জাতীয় নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে।

২০১৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয় নিয়ে দেখা দেয় চরম বিতর্ক। সেসময় অভিযোগ উঠে যে রাশিয়ার হ্যাকারদল নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে ট্রাম্পকে বিজয়ী করতে সহায়তা করেছে। বিজিত প্রার্থী হিলারী ক্নিনটন শিবির এই অভিযোগ জোরেসোড়ে তুললেও ফল উল্টাতে ব্যর্থ হন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ এনে আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন হিলারী শিবির। অন্যদিকে ২০২০ সালের ৩ নভেম্বর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট পদে জো বাইডেনের শপথ গ্রহণ পর্যন্ত নানা নাটকীয়তা ও অভিযোগ তোলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি নিজেকে বিজয়ী মনে করে ক্ষমতা না ছাড়ার ঘোষণাও দেন। ট্রাম্প সমর্থকরা ক্যাপিটল হিলে হামলা ও দখল করে নেয়। যা মার্কিন নির্বাচনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা। ওই সময় দেশটির আমলা কিংবা নির্বাচনে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঠিক ভূমিকার জন্য ট্রাম্পের উগ্র সমর্থকরা পিঁছু হটতে বাধ্য হন। ক্ষমতা হস্তান্তর হয় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বাইডেনের হাতে।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে দেখা যায়, বিগত নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছতা বা নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আস্থা সংকটের মধ্যেই দায়িত্ব পালন করছেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখছে প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে। জোটভিত্তিক বা জোটের বাইরে থেকে শাসন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে এই দলগুলো।

দেশে প্রথমবারের মতো নির্বাচনকালীন সরকার বা নির্বাচন নিয়ে চরম আস্থাহীনতা শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। সংকট থেকে উত্তরণে তৎকালীন সরকার জামায়াতের প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফর্মূলা বাস্তবায়ন করলে বিরোধী দল আওয়ামী লীগ তা মেনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়। একই ব্যবস্থার অধীনে ২০০১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জামায়াতসহ চারদলীয় জোট। ফলে একই প্রক্রিয়ায় পরবর্তী নির্বাচন আয়োজন করতে গেলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ বেঁকে বসে ও নির্বাচন বর্জন করে। ফলে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এরপর ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের ‘পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে’ আওয়ামী লীগ সরকার। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাশের মাধ্যমে কেয়ারটেকার সরকার বিলোপ করে দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিরোধী দলকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘অযথা গন্ডগোল করবেন না’।

কেয়ারটেকার সরকার বা নির্বাচন কালীন সরকার বাতিলের পর দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ দশম সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে। এতে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে বিএনপি ও জামায়াতসহ অধিকাংশ প্রধান রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে। ফলাফলে দেখা যায় সংসদীয় ৩০০ আসনের ১৫৪টিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিসহ মহাজোট প্রার্থীরা নির্বাচিত হন । যা বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত নির্বাচন হিসেবে উদাহরণ হয়ে আছে। এরপর ২০১৮ সালে একই আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে একাদশ সংসদ নির্বাচন হলে সেখানেও প্রশাসনের সহযোগিতায় রাতের বেলায় অনেক কেন্দ্রে ভোট প্রদান করে ব্যালট বাক্সভর্তি করা, কেন্দ্র দখল, বিরোধী দলের প্রার্থীর এজেন্টদের বুথ থেকে বের করে দেয়া, ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধা প্রদান, জাল ভোট দেয়া সহ নানা অনিয়ম হয়েছে। যা দেশের সকল গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশিত হয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না তা সহজে অনুমেয়।

আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে এমনি একটি শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিএনপি, জামায়াত, এলডিপি ও বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিসহ অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দল নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা পূর্নবহালের দাবি জানিয়ে আসছে। বৃহস্পতিবার(২৭ ফেব্রুয়ারি) বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রিপোর্টার্স ইউনিটির একটি মিটিংয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার যদি ক্ষমতায় থাকেন, তাহলে নিশ্চিত থাকতে পারেন নির্বাচন হবে না। বিএনপি নিয়মিতভাবে এমন দাবিই করে আসছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়াক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। একই রকম দাবি অন্য সকল রাজনৈতিক দলের।

এমনি পরিস্থিতিতে দেশের ভবিষ্যৎ কোনো অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। কেননা দেশের উন্নয়ন সহযোগী বিদেশী সকল পক্ষই এদেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন চাইছে। যাতে অতীতের কোনো নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি না হয়। এমতাবস্থায় ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত যেভাবে আন্দোলন করে তৎকালীন বিএনপি সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার আইন প্রণয়নে বাধ্য করেছিল, ঠিক সে পথেই আবার বিএনপি ও জামায়াত আন্দোলন করে বর্তমান আওয়ামীকে বাধ্য করবে তা হয়তো জানা যাবে আরো কিছুদিন অপেক্ষার পর। একদিকে নির্বাচনকালীন সরকারকে নিয়ে আস্থাহীনতার সংকট অন্যদিকে নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সংশয়। দু’ য়ের জটিলতায় আগামী নির্বাচন। ১১তম প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কাজী রকিব উদ্দিন ২০১৪ সালে পৃথিবীর সবচেয়ে বিতর্কিত নির্বাচন জাতির ঘারে চাপিয়ে দিয়েছে। একইভাবে ১২তম প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা ২০১৮ সালে নিশিরাতের ভোট অর্থাৎ ভোটের দিনের আগের রাতে ভোট সম্পন্ন করে আরেক ইতিহাসের সাক্ষী করেছে জাতিকে। তবে কমিশনের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ খন্ডাতে কমিশন দুটো কোনো কার্যকর পদক্ষেপও নিতে পারেনি।

এবার ১৩তম কমিশন গঠন করতে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে একাদশ সংসদের ষোড়শ অধিবেশনে ‘সার্চ কমিটি বিল-২০২১’ বিল পাশ করে। সে আইন অনুযায়ী কমিটি ১৩তম ইসি নিয়োগের সুপারিশ রাষ্ট্রপতির কাছে জমাদানের পর বৃহষ্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কাজী হাবিবুল আউয়াল-এর নেতৃত্বে অন্য চার কমিশনার শপথ নিয়েছেন। নতুন কমিশন কোন পথে কাজ করবেন তা এখন দেখার অপেক্ষা। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অতীত কর্মকান্ড নিয়ে এরই মধ্যে সমালোচনা শুরু করেছেন অনেক বুদ্ধিজীবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সব সমালোচনা ও অতীতকে উতড়ে এই কমিশন কতটুকু স্বচ্ছ , নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিতার সাথে কাজ করবে তা এখন দেখার পালা। বাংলাদেশের বাস্তবতায় নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে কোনো মহল আস্থাশীল হতে পারছে না। কারণ অতীতের সকল রেকর্ড বা বর্তমান নির্বাচনী পরিবেশ তা বলে না। নির্বাচন কমিশন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর যেমন আস্থা দরকার, তেমনি নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে পূর্ণ স্বস্থি ও আস্থা জরুরি। যেহেতু নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশনকে কাজ করতে হয়, সেহুতু সেই সরকারের কাঠামো ও সেসময়ে সরকারের ভূমিকাই সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নির্ধারন করবে। ভবিষ্যৎ গভীর সংকট এড়াতে সেই সর্বসম্মত পদ্ধতি বের করতে সরকার ও সকল পক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।