ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ
  • অমর একুশে বইমেলা চলবে ১৭ মার্চ পর্যন্ত**
  • টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে তিনটি ট্রাকের সংঘর্ষে ১ জন নিহত
  • গাইবান্ধায় পুলিশের সাথে বিএনপি’র ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া
  • ঘোষণা ছাড়াই বন্ধ পাসপোর্ট কার্যক্রম, ভোগান্তিতে মানুষ

জায়েদ আনসারী

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৬:০২

বিতর্কিত নয়, প্রত্যাশা সতর্ক ইসি

25178_514.jpg
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। জাতীয় ও স্থানীয় সকল নির্বাচন পরিচালনা করে আসছে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি। একটি আইনি প্রক্রিয়ায় সকল কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকে নির্বাচন কমিশন। বলতে গেলে সংবিধান যেমন গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ, তেমনি নির্বাচন কমিশনও গণতন্ত্রের সূতিকাগার। স্বাধীনতা উত্তরে দেশে বেশ কয়েকটি জাতীয় ও অসংখ্য স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। এতে যেমন রয়েছে বিতর্ক, তেমনি রয়েছে কাজের ধারাবাহিকতা ও সময়োপযোগী আধুনিকায়ন।

সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের এই অঙ্গটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদাসহ অন্য কমিশনারদের মেয়াদপূর্তি হয়ে বিদায় নিয়েছেন। বিদায় বেলায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের ভিন্ন সংবাদ সম্মেলন আয়োজনে তাদের মধ্যে থাকা বিভেদ সুস্পষ্ট হয়েছে। একই সাথে তাদের কার্যকালে জাতীয় স্বার্থে কি পরিমাণ স্বস্থিদায়ক কাজ হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অবশ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা কিছু ভুল কাজ করার কথা স্বীকারও করেছেন। তবে সেই ভুল কি দেশের হারানো প্রাণগুলোকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারবেন হুদা কমিশন? ফিরিয়ে দিতে পারবেন কি বঞ্চিতদের অধিকার? না পারবেন ক্ষতিগ্রস্থদের সম্পদ ফেরত দিতে। তাহলে কমিশন কোন স্বার্থে এসবের সুযোগ দিলেন। কেনইবা একাধিক ভুলের উপলব্ধির সাথে সাথে পদত্যাগ করলেন না। কিংবা সংশোধনে কার্যকরী পদক্ষেপ নিলেন না? না এটি জাতিকে সেই ‘জুতো মেরে মাল্যদানের’ খেলা!

সদ্য বিদায়ী নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পেয়েছিলেন ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। এই কমিশনের অধীনে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেশের সবকটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে যেমন সরকারি দলকে কারচুপি, ভোটকেন্দ্র দখল, জালভোট দেয়ার সুযোগ, রাতের বেলায় ভোট কাস্ট করার অভিযোগ উঠেছিল, তেমনি নির্বাচনী সহিংসতায় হতাহতের ঘটনাও কম ঘটেনি। এছাড়া বাস্তবিক অর্থে ভোট দিতে গিয়েছিলেন মাত্র চার-পাঁচভাগ মানুষ বলে অভিযোগ রয়েছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর। ভোট বর্জনের ঘটনাও রয়েছে অহরহ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তো জামায়াত ও বিএনপিসহ অন্যান্য প্রায় সকল প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা ভোট বর্জন করেছিল। তথ্যমতে, সকল পর্যায়ের নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এবং প্রাণহানি হয়েছে। সর্বশেষ ছয়ধাপের ইউপি নির্বাচনে প্রাণ হারিছেন অন্তত ১০০ জন। আহত হয়েছেন কয়েক সহস্র। সতর্ক বা দায়িত্বহীনতার কারণে সকল পর্যায়ের নির্বাচনে প্রাণহানি ঘটেছে। যা কমিশনের ভূমিকাকে চরমভাবে বিতর্কিত করেছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়মের ভূরি ভূরি অভিযোগ করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। জামায়াত ও বিএনপিসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন বর্জন করায় সংসদীয় ৩০০ আসনের ১৫৪টিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী। এটি বাংলাদেশের তথা বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত নির্বাচন।

বাংলাদেশের তৎকালীন মোট ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ৯৭৭ জন ভোটারের মধ্যে কাগজে কলমে ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছিলো ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৮ জন।

সেই নির্বাচনের পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলগুলোর মতে, নির্বাচনে খুব কম ভোটারই সত্যিকার অর্থে ভোট দিয়েছিলেন। এরপর ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে সহিংসতায় মারা যান ১৪৩ জন।

রকিব কমিশনের বিরুদ্ধেও অনিয়ম ও পক্ষপাতসহ নানা অভিযোগ উঠেছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনসহ দেশের সর্বস্তরে। কিন্তু সেই কমিশনের এসবের কোনো প্রতিকার করেনি পরবর্তী হুদা কমিশন বরং যোগ করেছেন সেই সকল কর্মকান্ডে নতুন মাত্রা ও সংস্করণ। এই দুই কমিশনকে বৈধতা দিয়ে একাদশ সংসদের ষোড়শতম অধিবেশনে ‘সার্চ কমিটি বিল-২০২২’ পাশ করা হয়। এই আইনের দ্বারা রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন করে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। একই সাথে আগের দুটি কমিশনকে বৈধতা দিয়ে বিগত সময়ের হুদা ও রকিব কমিশনের কোনো কর্মকান্ড নিয়ে মামলা করার সুযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়।

রাষ্ট্রপতি ১৩তম নির্বাচন কমিশন গঠনে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে সার্চ বা অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছেন। এতে সদস্য হিসেবে আছেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান, মহাহিসাব নিরীক্ষক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী এবং সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন। এছাড়া কমিটিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত সদস্য হিসেবে বিশিষ্ট দু'জন নাগরিক হলো সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. ছহুল হোসাইন এবং কথাসাহিত্যিক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনোয়ারা সৈয়দ হক।

সার্চ কমিটি নির্বাচন কমিশন গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কমিশনার নিয়োগে নাম প্রস্তাব চেয়ে চিঠি দেন। কিন্তু সার্চ কমিটির সদস্যদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ তুলে কমিটিকে প্রত্যাখান করে নাম প্রস্তাব করেনি বিএনপিসহ বৃহৎ অনেক রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দলগুলো কারণ হিসেবে দেখছে যে, বিগত কে এম নুরুল হুদা সরকারি আমলা থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচীতে অংশ নিয়েছিলেন। সার্চ কমিটি তাকেও নিয়োগদানে সুপারিশ করেছিল। কাজী রকিব আহমেদ কমিশনও একই ধারার। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ অনেক ছোট ছোট রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে নাম প্রস্তাব করেছে অনুসন্ধান কমিটির কাছে। সব মিলিয়ে সেই তালিকা দাঁড়িয়েছে ৩২২ জনে।

দ্বিতীয় প্রক্রিয়ায় অনুসন্ধান কমিটি দেশের বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট নাগরিকদের সাথে দুইদিনে চার দফায় মতবিনিময় করেছেন কমিশন গঠনে। এতে অংশ নিয়ে নানারকম মত ও পরামর্শ দিয়েছেন তারা। আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক আমলা আলী ইমাম মজুমদার স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘সরকারের বিশেষ সুবিধাভোগী’ কোনো ব্যক্তি যেন নির্বাচন কমিশনে সুযোগ না পান। একই কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।

তবে অনুসন্ধান কমিটি প্রস্তাবকারী সংগঠনের নাম না জানিয়েই ইতিমধ্যে কিছু ব্যক্তির নাম প্রকাশ করেছেন। কিন্তু যে সার্চ কমিটিকে নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে, সেই সার্চ কমিটি কি সবার নিকট গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের খুঁজে বের করবেন? নাকি হুদা বা রকিব কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন। সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করা এখন সার্চ কমিটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ । বিগত অভিজ্ঞতা থেকে শঙ্কায় আছেন দেশের মানুষ। কেননা আগের কমিশনগুলো সুষ্ঠু ভোট আয়োজনে যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি প্রাণহানিসহ গণক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে অনেক। সেদিকটি কতটুকু বিবেচনায় রাখতে পারবে সার্চ কমিটি। সেটি হয়তো জানা যাবে রাষ্ট্রপতির কাছে ইসি গঠনে সুপারিশপ্রান্ত চূড়ান্ত নামের তালিকার মাধ্যমে।