ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ
  • অমর একুশে বইমেলা চলবে ১৭ মার্চ পর্যন্ত**
  • টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে তিনটি ট্রাকের সংঘর্ষে ১ জন নিহত
  • গাইবান্ধায় পুলিশের সাথে বিএনপি’র ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া
  • ঘোষণা ছাড়াই বন্ধ পাসপোর্ট কার্যক্রম, ভোগান্তিতে মানুষ

আব্দুল খালেক

২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১১:০১

আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি একজন মাহাথির মোহাম্মদ

24425_mahathir-mohammad.jpg
মালয়েশিয়ার  ন্যাশনাল হার্ট ইনস্টিটিউটে (আইজেএন)  ভর্তি থাকা মাহাথিরের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে গুজব। মৃত্যুর সংবাদ নেই কোনো নির্ভরযোগ্য সাইটে। তার স্বাস্থ্য ভালোর দিকে। তার ক্ষুধার উন্নতি হয়েছে এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। পরিবারের ছোট্ট সদস্যদের সাথে হাসিঠাট্টায়ও মেতেছেন তিনি। মালয়েশিয়ার সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ জনসাধারণকে তার স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা না করার আহ্বান জানিয়েছেন। মাহাথিরের হার্টের সমস্যার ইতিহাস রয়েছে ফলে ১৯৮৯ এবং ২০০৭ সালে দুটি হার্ট বাইপাস সার্জারি করা হয়েছিল।

মাহাথির মোহাম্মদের মেয়ে দাতিন পাদুকা মেরিনা মাহাথির কিছুটা বিরক্তির সুরে বলেছেন, ‘আমার বাবা আগে চেয়ে অনেক সুস্থ আছেন। আপনাদের অতিমাত্রায় কৌতূহলের ফলে আমরা পারিবারিকভাবে উদ্বিগ্ন। দয়া করে মাহাথির মোহাম্মদকে নিয়ে কোনো ভুয়া খবর প্রচার করবেন না। তাকে নিয়ে অতিমাত্রায় খবর প্রচার বন্ধ রাখুন। এই গুজব আমার পরিবারের জন্য প্রচন্ড হয়রানিমূলক।’

ছোটবেলায় রাস্তায় কফি আর কলা ভাজা বিক্রি করতো ছেলেটি। কুকুরকে ভীষণ ভয় পেত সে। পথে কোনো কুকুর দেখলেই প্রচণ্ড ভয়ে দৌড়াতে শুরু করতো। এই ভয় তাকে অস্থির করে তুলতো। একদিন ছেলেটি প্রতিজ্ঞা করলো আর ভয় পাবে না সে। সিদ্ধান্ত নিলো- যখনই কুকুর দেখবে তখনই চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে থাকবে। সিদ্ধান্ত কাজে দিল। এই সিদ্ধান্তই পাল্টে দিলো তার জীবনের মোড়।

কারো রক্তচক্ষুই আর ভয় পেত না ছেলেটি। সমস্যা এলে ভয়ে তা থেকে পালিয়ে না গিয়ে তাকে মোকাবিলা করা, সমস্যা উৎস খুঁজে বের করা পরিণত হয় তার স্বভাবে। এই স্বভাবই তাকে পৌছেঁ দেয় সাফল্যের চূড়ায়। যার কথা বলছি তিনি আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার-জনক ডা. মাহাথির বিন মোহাম্মদ।

তার মেধা, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। সদাবিনয়ী, হাস্যোজ্জ্বল ও স্বতঃস্ফুর্ত এক অসাধারণ মানুষ। বিরলপ্রজ ব্যক্তিত্ব, কর্মে খ্যাতিতে অদ্বিতীয় প্রবাদপুরুষ, এশিয়ার নন্দিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিশ্ববরেণ্য এই নেতা এখন অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি।

১৯২৫ সালের ১০ জুলাই মালয়েশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর এ্যালোর সেটর-এ এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন মাহাথির। তাকে নিয়ে মালয়েশিয়া প্রবাসীদের মাঝে একটি গুজব রয়েছে। মাহাথিরের দাদার বাড়ী নাকি বাংলাদেশের চট্রগ্রাম। তবে নিরপেক্ষ কোন সুত্র থেকেন এর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি বা মাহাথিরও কোনদিন নিজ মুখে এসব কথা বলেননি। আর একারণে সাধারণ বাংলাদেশীদের কাছে তার আবেদন অনেক বেশি।
 
 পিতা-মাতার নয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠতম। তার পিতা স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন এবং পরবর্তীকালে একজন সরকারি অডিটর হিসেবে কাজ করেছেন। তার পিতা ছিলেন অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ একজন মানুষ। শৃঙ্খলা এবং গুছিয়ে চলার যে সহজাত গুণ মাহাথিরের পরবর্তী জীবনে খুঁজে পাওয়া যায়, সেটি তিনি তার পিতার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। মাহাথির ছোটবেলা থেকেই দারুণ সুশৃঙ্খল জীবন পালন করেছেন। দেশের শক্তিশালী ভিত্তি গড়ার এই কারিগরের জীবনের ভিত্তি কিন্তু গড়ে দিয়েছিলেন তার বাবা-মা।

মাহাথিরের মা সাধারণ গৃহিণী হলেও ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন এবং মাহাথিরকে বাসায় পবিত্র কোরআন শিক্ষা দিতেন। বাসায় তাদের একজন ধর্ম শিক্ষক ছিলেন যিনি প্রতিদিন বাড়িতে এসে পবিত্র কোরআন, ইসলাম ধর্মের উপর বিশ্বাস এবং ধর্মীয় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান শেখাতেন। ইসলাম ধর্মের প্রতি বিশ্বাস মাহাথিরের ভিতর আসে পরিবার থেকে। ধর্মীয় চেতনায় মাহাথির মাহাথিরের পরিবার তাকে ইসলামের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে শিক্ষা দেয়, কিন্তু তাদের কোন রূপ গোঁড়ামি ছিল না।

মাহাথির বলেন, ‘ইসলাম ধর্ম আমাদের জীবনের অংশ। একে পরিত্যাগ করার কোনো কারণ নেই। ধর্ম কখনই অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বাধা হতে পারে না। ইসলাম শুধু মাত্র সপ্তম শতাব্দীর ধর্ম নয়। ইসলাম অবশ্যই সর্বকালের ধর্ম।’

ছোটবেলায় মাহাথির খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। মাহাথির শৈশবে প্রথমে মালয় ও পরে ইংরেজি স্কুলে শিক্ষা লাভ করেন। শিক্ষা জীবন শুরু করেন সেবেরাং পেরাক মালয় স্কুলে। পরে আলোর সেতারের গভর্নমেন্ট ইংলিশ স্কুলে ভর্তি হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ সালে জাপান মালয়েশিয়া আক্রমণ করে। তারা ইংরেজি মাধ্যম স্কুল বন্ধ করে দেয় এবং একটি জাপানি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। মাহাথিরের বয়স তখন ১৬। প্রথমে তিনি জাপানি স্কুলে যেতে চাননি।

ঐ সময় মাহাথির একটি স্থানীয় ছোট বাজারে কলা বিক্রি শুরু করেন। কিন্তু পিতার চাপে তিনি পরবর্তীতে ঐ জাপানি স্কুলে ভর্তি হন। মালয়েশিয়ায় জাপানি শাসন প্রায় তিন বছর স্থায়ী ছিল। ১৯৪৭ সালে তিনি সিঙ্গাপুরের কিং এডয়ার্ড মেডিসিন কলেজে (বর্তমান সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন এবং চিকিৎসা শাস্ত্রে অধ্যয়ন সমাপ্ত করেন। এসময় মাহাথির মালয় জাতির বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি সিঙ্গাপুর থেকে মালয়েশিয়া ফিরে আসেন।

মাহাথির বলেন, ‘আমরা ছিলাম ব্রিটিশ শাসনের অধীন। তারপর জাপানিরা আসল, তারা আমাদের থাইদের কাছে ছেড়ে দিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল যে, আমরা একটা ফুটবলের মতো যে কেউ আমাদেরকে এদিক সেদিক লাথি মারতে থাকল। আমার এ রকমটি পছন্দ হয়নি। আমি অনুভব করতে থাকি যে, মানুষজন আমাদের সম্মান করত না। আমার মনে হয়েছিল- অন্যদের মতো আমাদের কেউ সমানভাবে দেখা উচিত। এই ব্যাপারটিই আমাকে সামনে আসতে উৎসাহ দেয় যে, মালয়েশিয়া অন্য দেশগুলোর মতোই একটি ভালো দেশে পরিণত হতে পারে।’

সিঙ্গাপুরে পড়ার সময় মাহাথিরের সিথি হাসমাহ মো. আলীর সাথে পরিচয় হয়। সিথি হাসমা তখন দ্বিতীয় মালয় নারী হিসেবে সিঙ্গাপুরে বৃত্তি নিয়ে একই কলেজে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়ছিলেন। ১৯৫৬ সালের ৫ আগস্ট মাহাথির ও সিথি হাসমা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন তার বয়স ছিল ৩৩ বছর এবং তার স্ত্রী ডা. সিথি হাসমার বয়স ছিল ২২ বছর। তাদের মোট সাত জন সন্তান আছে, যার মধ্যে তিন জনকে তারা দত্তক নিয়েছিলেন। তারা হলেন- মারিনা, মিরজান, মেলিন্ডা, মুখজানি, মুখরিজ, মায়জুরা ও মাজহার। পরিবার সম্পর্কে মাহাথির বলেন, ‘প্রত্যেকের নিজ পরিবার একটি নিরাপদ জায়গা - যা আমাদের এই জটিল সমাজে স্থিরতা আনে।’

১৯৫৩ সালে সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে এসে মাহাথির একজন চিকিৎসক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। মালয়েশিয়ার স্বাধীনতার ঠিক পূর্বে তিনি সরকারি চাকুরী ছেড়ে নিজ শহর এ্যালোর সেটরে মাহা-ক্লিনিক নামে একটি প্রাইভেট ক্লিনিক শুরু করেন। শহরের পাঁচটি প্রাইভেট ক্লিনিকের মধ্যে এটি একমাত্র মালয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তির মালিকানাধীন ক্লিনিক ছিল।

তিনি রোগীদের বাড়িতে যেতেন এবং মাঝে মাঝে ছোট খাট অস্ত্রোপচার করতেন। মাহাথিরের মতে, চিকিৎসক হিসেবে তার প্রশিক্ষণ ও প্রাকটিস তার মধ্যে স্থিরতা এনেছিল ও তাকে যে কোন পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে সক্ষম করেছিল।

তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা বিদ্যায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকের জন্য রাজনীতি একটি ভালো পেশা। একজন ডাক্তার রোগীকে পর্যবেক্ষণ করেন, স্বাস্থ্যগত ইতিহাস রেকর্ড করেন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন, ল্যাব পরীক্ষা করেন এবং চূড়ান্তভাবে রোগ নির্ণয় করেন। তার কাছে এ প্রক্রিয়াটি রাজনীতির মতই।’

বিপ্লবী মাহাথির:

মাহাথিরের বয়স যখন কুড়ি বছরের একটু বেশি তখন তিনি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। সহপাঠীদের একত্র করে তিনি গোপনে ‘মালয়ান ইউনিয়ন’ প্রস্তাবের বিরুদ্ধচারণ শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জাপানীরা চলে যাবার পূর্বে তৎকালীন মালয়েশিয়াকে তারা থাই সরকারের শাসনাধীনে হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে ব্রিটিশরা আবার ফিরে আসে এবং ‘মালয়ান ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠা করে।

মালয়ান ইউনিয়ন সত্যিকার অর্থে সম্পূর্ণ উপনিবেশ ছিল। মাহাথির ও তার বন্ধুরা তখন রাতের অন্ধকারে সারা শহরে রাজনৈতিক বাণী সম্বলিত পোষ্টার লাগাতেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সীমিত, ‘মালয়ান ইউনিয়ন’ প্রস্তাবের সমাপ্তি এবং প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা ফিরে পাওয়া।

সাইকেল চালিয়ে তারা সমগ্র প্রদেশ ঘুরে ঘুরে জনগণকে ব্রিটিশ বিরোধী হিসেবে সংঘটিত ও সক্রিয় করার কাজে ব্যস্ত থাকতেন। সংগঠনে মাহাথির সাধারণত সম্পাদক বা দ্বিতীয় অবস্থানটা বেছে নিতেন, কারণ দ্বিতীয় ব্যক্তিকেই বেশি সাংগঠনিক কাজ করতে হয় ও অন্য দলগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়।

মাহাথির প্রথম কেদাহ মালয় যুব ইউনিয়ন এবং পরে কেদাহ মালয় ইউনিয়ন নামে রাজনৈতিক দল সংগঠিত করেন, যা পরবর্তিতে ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন বা ইউএমএনও হিসেবে পরিচিত হয়। সিঙ্গাপুরে থাকাকালীন মাহাথির সেখানের কলেজের মালয় ছাত্রদের নিয়ে ‘মালয় ছাত্র সংগঠন’ গঠন করেন। তবে এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল ছাত্রদের শিক্ষার মান ও ফলাফল উন্নয়ন করা। এর কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না।

মাহাথিরের রক্তে মিশে ছিল দেশাত্মবোধ আর রাজনীতি। সরকারি চাকরিতে থাকাকালীন তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতে পারেন নি। নিজ ক্লিনিক চালু করার পর ১৯৭৪ সাল নাগাদ সাত বছর তিনি চিকিৎসক হিসাবে পেশা ধরে রেখেছিলেন। তবে জাতীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকে। ইউএমএনও-এর প্রাদেশিক শাখার ঊর্ধ্বতন পদে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

সাধারণ মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠা মাহাথির ১৯৬৪ সালে ৩৯ বছর বয়সে কোটা সেটর দক্ষিণ এলাকা থেকে বিপুল ভোটে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এমপি হওয়ার পরে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেন মালয়ীদের সমস্যার কথা বলতে, কিন্তু বারবার বাধাগ্রস্ত হন। ১৯৬৯ সালের ৩০শে মে কুয়ালালামপুরে যখন চীনা ও মালয় জাতির মধ্যে তুমুল-দাঙ্গার জন্য মাহাথির ইউএমএনও নেতৃত্বকে দোষারোপ করে প্রধানমন্ত্রী টুঙ্কু আব্দুর রহমাকে কড়া ভাষায় চিঠি লেখেন ও পদত্যাগের পরামর্শ দেন। এ সমালোচনা পার্টি নেতৃবৃন্দেরা সহ্য করলেন না, তার মাহাথিরকে দল থেকে বহিষ্কার করলেন।

১৯৬৯ সালে তিনি একটি বই লেখেন, যার নাম ‘মালয় ডিলেমা’ বা মালয়ীদের উভয় সংকট। বইটি নিষিদ্ধ করা হয়। বইটিতে তিনি মন্তব্য করেন, দেশটির মালয় জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি সর্বদা সত্য উচ্চারণে ছিলেন নির্ভীক ও আপসহীন। পরবর্তী তিন বছর তিনি নিজ দেশেই রাজনীতি থেকে নির্বাসনে ছিলেন। ১৯৭২ সালের ৭ মার্চ মাহাথিরকে আবার দলের সদস্য ও সিনেটর হিসেবে পুনর্বহাল করা হয়।

পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের নির্বাচনে তিনি এমপি নির্বাচিত হন; তাকে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। শিক্ষামন্ত্রী হয়ে তিনি ঘোষণা দেন তার নামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা যাবে না। এই ধারা তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েও অব্যাহত রাখেন। তার কোনো ছবি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা সরকারি অফিসে টাঙানো যাবে না বলেও তিনি নির্দেশ দেন।

মালয়েশিয়াকে বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষা সংস্কার হচ্ছে মাহাথিরের প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। ১৯৭৫ সালে মাহাথির পার্টির ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৭৬ সালের ৫ মার্চ থেকে ১৯৮১ সালের ১৬ জুলাই পর্যন্ত উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮১ সালের ১৬ই জুলাই ৫৫ বছর বয়সে ডা. মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার আগে যে তিনজন প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া শাসন করেছেন তারা সবাই ছিলেন সমাজের অভিজাত শ্রেণির। সেই হিসেবে মাহাথির বেশ সাধারণ ঘর থেকেই উঠে এসেছেন।

তার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন দল পর পর পাঁচবার সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। তিনি এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য টানা ২২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ৭৭ বছর বয়সে ২০০৩ সালের ৩১ অক্টোবর স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ও রাজনীতি থেকে বিদায় নেন।

অবসর গ্রহণের দীর্ঘ পনের বছর পর ৯২ বছর বয়েসে প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের ব্যাপক দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতার কারণে মাহাথির মোহাম্মদ আবারও আসেন রাজনীতিতে। ২০১৮ সালের ৯ মে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে জয়ের পরদিন ১০ মে মালয়েশিয়ার সপ্তমবারের মত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি পদত্যাগ করেন।

দেশে শৃঙ্খলা আনয়ন:

ডা. মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি- দেশের জন্য কাজ করা এবং একে ভালো কিছু দেয়ার সুযোগ গ্রহণ করাটা খুবই স্বস্তিদায়ক। এটা এ জন্য নয় যে আপনি টাকা কামাচ্ছেন বরং এটা এ জন্য যে আপনাকে আপনার কাজে সন্তুষ্ট রাখছে।
আমাদের বিবেচনা করতে হবে আমাদের সম্পদকে, আমাদের সামর্থ্যকে, আমাদের অবস্থাকে এবং সামনে আসন্ন পরিবর্তনকে যাতে আমরা আমাদের দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অবদান রাখতে পারি।

যাদের আপনি বিশ্বাস করতে পারেন না, তাদের যে দায়িত্ব দেবেন তা তারা আদৌ ঠিকভাবে করবে কি না সেই সংশয় থেকে বের হওয়া কঠিন। যত দিন সুযোগ পাই জনগণের সেবা করে যাব। আমার ইচ্ছা যেন আমি আরও বেশি কিছু করতে পারি।’ মাহাথির মোহাম্মদের শাসনকালীন কৃতিত্ব হলো, তিনি মালয়েশিয়াকে একটি উন্নত, শিল্পনির্ভর দেশে পরিণত করেছেন প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে। ঔপনিবেশিক শোষণে জীর্ণ দেশটি তাঁর চেষ্টায় হয়ে ওঠে উন্নত মানের একটি রাষ্ট্র। এটা এত সহজ ছিল না। ফলে দেশের সাধারণ মানুষ মাহাথির শাসনের কাঠিন্যে গুরুত্ব দেয়নি, অর্থনৈতিক উন্নতিকেই বড় করে দেখেছেন।

মাহাথির ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। কর্মীদের যা বলেছেন, তা নিজে করেও দেখিয়েছেন। সরকারি কর্মীরা যেন ঠিক সময়ে অফিসে আসেন সে জন্য নিজেও ঠিক সময়ে অফিসে আসতেন।  প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও সাধারণ মানুষের একদম কাছাকাছি থাকতেন এই নেতা। এই বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই কিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার পরও তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। মাহাথিরই পৃথিবীর একমাত্র প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, যিনি নিজের নাম লেখা ব্যাজ পরতেন।

মালয়েশিয়ার সব মুসলিমের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন তিনি। মালয়েশিয়ানদের শিক্ষার ৯৫ শতাংশ খরচ সরকার বহন করে। এই নীতি চালু হয় মাহাথিরের আমল থেকে। আশির দশকে গৃহীত ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি বাস্তবায়ন করা শুরু করেন তিনি। ফলাফলে, ১৯৯২ সালে নিজ দেশের সবাইকে কর্মসংস্থান দিয়ে উলটো আরও ৮ লাখ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ দেয় মালয়েশিয়া।

পপট্রোনাস টুইন টাওয়ার নির্মাণ, সমুদ্র থেকে ৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি উদ্ধার, অত্যাধুনিক এয়ারপোর্ট তৈরি, একাধিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, হাইওয়ে নির্মাণসহ তার অসংখ্য উদ্যোগ সফল হয়েছে। কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, পুত্রাজায়া, নর্থ-সাউথ এক্সপ্রেসওয়ে, বাকুন জলবিদ্যুত ড্যাম সহ অসংখ্য মেগা প্রকল্প বদলে দেয় দেশটির ল্যান্ডস্ক্যাপ।
স্বাধীনতার সময় যে মালয়েশিয়ার অধিকাংশ জনসমষ্টি ছিল বেকার অথবা অর্ধবেকার, সেই মালয়েশিয়া রূপান্তরিত হয়েছে সুস্থ, নিরাপদ, উদার, কল্যাণমুখী জনপদে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে দশজন যুবক দাও, আমি মালয়ীদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্বজয় করে ফেলব’।

মালয়েশিয়ার নতুন প্রজন্মকে তিনি স্বদেশপ্রেমে এমনভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন যে, তারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। এক আদর্শিক চেতনা নিয়ে মাহাথির দারিদ্র্যের তলানীতে অবস্থান করা মালয়েশিয়াকে তুলে এনেছেন উন্নয়ন আর আধুনিকতার শীর্ষে।

দারিদ্র্যপীড়িত অগোছালো মালয়েশিয়াকে পৌঁছে দিয়েছেন স্বপ্নিল সাফল্যের বিশ্বে। আপাদমস্তক বাস্তববাদী এবং দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ মাহাথিরের রাষ্ট্র পরিচালনা এবং উন্নয়নের মন্ত্র রোলমডেল হিসেবে স্বীকৃত। নিজ দেশের উন্নয়নের কাণ্ডারি বিবেচিত তিনি।
  
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সংস্কার:

ডাঃ মাহাথির মোহাম্মদ বিশ্বময় আধুনিক মালয়েশিয়ার প্রধান রূপকার হিসেবে পরিচিত। প্রধানমন্ত্রী হবার পর তিনি সকল বিষয় পুনঃপরীক্ষা করেন। সকল নীতি, পদ্ধতি, সরকার চালাতে প্রাত্যহিক সকল কাজ, আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হয়। তার সরকার সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ওয়ার্ক-ফ্লো চার্ট আর অফিস ম্যানুয়েল প্রবর্তন করেন। মাহাথির ও তার সরকার দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচি তৈরি করেন যার মাধ্যমে প্রত্যেকে তার নিজ নিজ ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন হয়। ব্যবসা এবং রাজনীতিতে ফুটপাতের লোক থেকে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পর্যন্ত দেশের জন্য নিজের জন্য কাজ করবে।
 
১৯৯০ সালে মালয়েশিয়া বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৮% ছাড়িয়ে যায়। মাহাথির ১৯৭১ সালে প্রনিত নিউ ইকোনমিক পলিসি (এনইপি) সফল ভাবে বাস্তবায়নে সচেষ্ট হন। এনইপির উদ্দেশ্য ছিল জাতি নির্বিশেষে দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে জাতি পরিচয় মুছে ফেলা। নতুন সম্পদ সৃষ্টি করা এবং এর বৃহত্তর অংশ দরিদ্রদের জন্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে সম্পদের পুনঃবণ্টনের চেষ্টা করা হয়। ১৯৯১ সালে বিশ বছর মেয়াদি এনইপি শেষ হয়। দারিদ্র্য বিমোচন বহুলাংশে অর্জিত হয়। সমৃদ্ধির একটি পর্যায়ে পৌছে মালয়েশিয়া বিভিন্ন জাতির সুসম্পর্কসহ একটি জাতিতে পরিনত হয় যা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য ঈর্ষনীয়। বিশ বছর মেয়াদি এনইপি শেষ হবার পর দশ বছর মেয়াদি ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি (এনডিপি) প্রনয়ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আব্দুল খালেক
কলামিস্ট ও গবেষক